বাজেটে বাড়ছে করমুক্ত আয়সীমা: স্বস্তির মাঝেও নিম্ন আয়ের করদাতাদের ওপর বাড়ছে চাপের আশঙ্কা - Uttorpatro TV রিটার্ন জমা দিলেই মিলবে করছাড়! বছরজুড়ে আয়কর রিটার্ন দাখিলের নতুন পরিকল্পনা এনবিআরের

বাজেটে বাড়ছে করমুক্ত আয়সীমা: স্বস্তির মাঝেও নিম্ন আয়ের করদাতাদের ওপর বাড়ছে চাপের আশঙ্কা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ২০, ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন তলানিতে, ঠিক তখনই আসন্ন বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বিদ্যমান সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পৌনে ৪ লাখ (৩ লাখ ৭৫ হাজার) টাকা করা হতে পারে।

আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ক্ষমতাসীন দল বিএনপির এই মেয়াদের প্রথম বাজেট পেশ করবেন। মূলত ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকা কম আয়ের করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদও চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় আগামীতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর একটি রূপরেখা দিয়ে রেখেছিলেন। নতুন সরকার এসে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই মধ্যবিত্তের কল্যাণে এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে।

সূত্রমতে, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির এই সুবিধা শুধু সাধারণ করদাতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর পাশাপাশি নারী করদাতা, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিক, তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের ক্ষেত্রেও এই সীমা আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ জন্য করমুক্ত আয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রতিবন্ধী সন্তানের মাতা-পিতা বা আইনানুগ অভিভাবকদের জন্যও প্রতি সন্তানের বিপরীতে অতিরিক্ত করমুক্ত সীমার সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে।

প্রথম নজরে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, এর ভেতরে ছোট করদাতাদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণও লুকিয়ে রয়েছে। এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছর থেকে ন্যূনতম ৫ শতাংশের করহারের ধাপটি সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হতে পারে। এর পরিবর্তে যাঁদের বার্ষিক আয় পৌনে ৪ লাখ টাকার বেশি হবে, তাঁদের সরাসরি ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হতে পারে।

প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী, করমুক্ত সীমার পরবর্তী প্রথম ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার জন্য ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার জন্য ২০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকার জন্য ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর আরোপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এর ফলে বর্তমান নিয়মের তুলনায় ছোট করদাতাদের ট্যাক্সের পরিমাণ করমুক্ত আয়সীমা বাড়ার পরও বৃদ্ধি পাবে। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি প্রথম এক লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে ৫ হাজার টাকা কর দিতে হয়। কিন্তু নতুন নিয়মে কোনো করদাতার বার্ষিক আয় সাড়ে চার লাখ টাকা হলে, করমুক্ত পৌনে ৪ লাখ টাকা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ৭৫ হাজার টাকার ওপর সরাসরি ১০ শতাংশ হারে সাড়ে সাত হাজার টাকা কর দিতে হবে। অর্থাৎ, ওই করদাতার খরচ উল্টো আড়াই হাজার টাকা বেড়ে যাবে।

গ্রাফিকস: উত্তরপত্র

এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ জানান, গত চার বছর ধরে দেশে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। এ অবস্থায় করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো ইতিবাচক হলেও ছোট করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ দেওয়া ঠিক হবে না। বরং যাদের আয় অনেক বেশি, তাদের থেকে বেশি কর আদায়ের কৌশল নেওয়া উচিত।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদও একই ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, মূল্যস্ফীতির এই ক্রান্তিকালে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো যৌক্তিক হলেও করের হার বাড়িয়ে দিলে সাধারণ মানুষের ওপর দ্বিগুণ চাপ পড়বে। সরকারের উচিত করের বোঝা না বাড়িয়ে আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষকে প্রকৃত স্বস্তি দেওয়া।

আসন্ন বাজেটে আয়কর খাতে আরেকটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এখন থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে সারা বছরই অনলাইনে রিটার্ন জমার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তবে করদাতাদের দ্রুত রিটার্ন জমায় উৎসাহিত করতে এনবিআর একটি বিশেষ ‘টাইম-বেসড’ পুরষ্কার ও জরিমানার কাঠামো তৈরি করছে।

  • প্রথম প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর): এই সময়ে রিটার্ন দাখিল করলে মোট করের ওপর ৫ শতাংশ পর্যন্ত বিশেষ ছাড় বা রেয়াত পাওয়া যেতে পারে।

  • দ্বিতীয় প্রান্তিক (অক্টোবর-ডিসেম্বর): এই সময়ে কোনো ছাড় মিলবে না, তবে নিয়মিত নির্ধারিত কর দিলেই চলবে।

  • তৃতীয় প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ): এই সময়ে রিটার্ন দিলে নিয়মিত করের সাথে ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা যোগ হতে পারে।

  • চতুর্থ প্রান্তিক (এপ্রিল-জুন): বছরের শেষ প্রান্তিকে রিটার্ন জমা দিলে করের পরিমাণের ওপর ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি অর্থ বা জরিমানা গুণতে হবে।

এমনকি যাঁদের করযোগ্য আয় নেই কিন্তু টিআইএন (TIN) থাকার কারণে রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক, তাঁরাও দেরিতে রিটার্ন জমা দিলে স্বয়ংক্রিয় জরিমানার মুখে পড়বেন। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অনলাইনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, ফলে বাড়তি কর বা জরিমানা পরিশোধ না করে সিস্টেমে রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে না। বর্তমানে দেশে ১ কোটি ২৮ লাখ টিআইএন ধারী থাকলেও মাত্র ৪০ থেকে ৪২ লাখ মানুষ রিটার্ন দেন। এনবিআরের এই নতুন ডিজিটাল ও কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে করদাতার সংখ্যা এবং রাজস্ব আদায় দুই-ই বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।