নভেম্বর-ডিসেম্বরে শুরু হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন: ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ও সহিংসতা রুখতে কঠোর অবস্থানে বিএনপি - Uttorpatro TV ডিসেম্বরের মধ্যে শুরু হচ্ছে ইউপি ভোট, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মাঠপর্যায়ে তারেক রহমানের কড়া বার্তা

নভেম্বর-ডিসেম্বরে শুরু হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন: ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ও সহিংসতা রুখতে কঠোর অবস্থানে বিএনপি

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ২০, ২০২৬
গত ১৬ মে কুমিল্লায় এক পথসভায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই পথসভাস্থলের আশপাশের ব্যানার–ফেস্টুনগুলো মূলত ছিল স্থানীয় নির্বাচনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদেরফাইল ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল

দেশের তৃণমূল পর্যায়ে স্থবির হয়ে পড়া নাগরিক সেবা সচল করতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু করেছে সরকার। আগামী নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশজুড়ে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের জোর প্রস্তুতি চলছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে আসন্ন জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তবে এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সম্ভাব্য ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ও সহিংসতা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ভেতর এক ধরণের কৌশলগত উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই ইউপি নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। যেসব ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে, সেগুলোতে সবার আগে ভোট গ্রহণ হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা ও স্থানীয় সরকারের অন্যান্য স্তরের নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হবে।

গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে আসা সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিদের অপসারণ করে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর ফলে স্থানীয় সরকারের প্রায় প্রতিটি স্তর বর্তমানে জনপ্রতিনিধিশূন্য অবস্থায় রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও সচিবদের মাধ্যমে বিকল্প উপায়ে দাপ্তরিক কাজ চালানো হলেও এটি তাদের মূল দায়িত্ব না হওয়ায় সেবা গ্রহীতাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এই প্রশাসনিক শূন্যতা দূর করে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতেই দ্রুত ভোটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যেহেতু এবারের নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া হচ্ছে, তাই একই পদে দলের একাধিক নেতা মাঠে নেমে পড়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে। এই বাস্তবতায় দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্য বজায় রাখতে শক্ত অবস্থান নিয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। গত ৯ মে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে (কেআইবি) বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এক রুদ্ধদ্বার মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটিই ছিল দলের সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক বৈঠক, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১১ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, অতীতের সরকারের মতো কোনো প্রকার প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বা দলীয় সুবিধা ব্যবহার করে কাউকে বিজয়ী করার সুযোগ এবার থাকবে না। প্রতিটি প্রার্থীকে মাঠে কাজ করে জনগণের মন জয় করেই নির্বাচিত হতে হবে। সংসদ নির্বাচনে যারা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়েছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে স্থানীয় নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগ দিয়ে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

গত ৯ মে ঢাকার কেআইবি মিলনায়তনে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারীদের একাংশফাইল ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল

প্রতীকহীন নির্বাচনে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা। খামারবাড়ির বৈঠকে মাঠপর্যায়ের নেতারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নয়নের তাগিদ দিলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, যেকোনো মূল্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে এবং এ ক্ষেত্রে অপরাধীর রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। বিগত দিনে আন্দোলনের কারণে কিছুটা শিথিলতা থাকলেও এখন থেকে যেকোনো ধরনের সহিংসতা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মাঠপর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে যে কিছুটা স্থবিরতা চলে এসেছিল, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য এই স্থানীয় নির্বাচনকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে দলটির নীতিনির্ধারকেরা। অনেক নেতাকর্মী ব্যবসা-বাণিজ্য বা ঠিকাদারিতে ঝুঁকে পড়ায় এবং সংসদ সদস্যদের ঘিরে নিজস্ব বলয় তৈরি করায় দলের নিয়মিত কর্মসূচিতে কিছুটা ভাটা পড়েছিল।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে ১০ মে সারা দেশে জেলা ও মহানগর কমিটির কাছে বিশেষ চিঠি পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। চিঠিতে তৃণমূল পর্যায়ে সমন্বয় বাড়িয়ে দলীয় তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধীদের অপপ্রচার রুখতে এবং সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরতে দেশজুড়ে নতুন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক শূন্যতা দূর করার মাধ্যমই নয়, বরং মাঠপর্যায়ে সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং বিএনপির সাংগঠনিক শৃঙ্খলার জন্য এক বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।