দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাবমেরিন ক্যাবল। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ, ব্যান্ডউইথ সরবরাহ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক থাকায় এ খাতকে কৌশলগত হিসেবেই দেখা হয়। তবে বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবলের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন—বিটিআরসিতে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ সভার পর বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবলের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় গতি আসে। ওই সভায় তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সভাপতিত্বে এবং তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের উপস্থিতির কথা সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সভায় বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবলের লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর ২০২২ সালে বেসরকারি খাতে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, দেশের ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা, বাজার পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তিগত প্রয়োজনের যথাযথ মূল্যায়ন না করেই লাইসেন্সিং গাইডলাইনের সংশ্লিষ্ট বিধান পরিবর্তন করা হয়েছিল। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি করতে আবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমাও বাড়ানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি প্রতিষ্ঠান মূল্যায়নে এগিয়ে ছিল। এর মধ্যে সামিট কমিউনিকেশনস ৯২ দশমিক ৪৬ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়। সিডিনেট ৮৭ দশমিক ৬৪ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় এবং মেটাকোর ৮৬ দশমিক ৪৮ নম্বর পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিল। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান ফাইবার অ্যাট হোম ৭০ দশমিক ১২ নম্বর পেয়ে পঞ্চম অবস্থানে ছিল বলে সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন প্রতিবেদনের বরাতে অভিযোগ করা হয়েছে।
এই মূল্যায়ন ঘিরেই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, টেলিযোগাযোগ খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা না থাকা কিছু প্রতিষ্ঠান কীভাবে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি নম্বর পেল, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সামিট কমিউনিকেশনের মালিকানা নিয়েও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির একটি অংশের মালিকানা সাবেক মন্ত্রী ফারুক খানের ভাই ফরিদ খানের রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি দুবাইভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বড় অংশের শেয়ার মালিকানার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, এর ফলে টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন স্তরে একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সিডিনেট নিয়েও রয়েছে আলাদা বিতর্ক। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করার সময় তুলনামূলকভাবে নতুন ছিল। এর সঙ্গে সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত এবং চৌধুরী নাফিজ শরাফতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও মালিকানা কাঠামোর স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
মেটাকোরের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ছেলে রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিকসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অ্যাম্বার আইটির প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আমিনুল হাকিমের সম্পৃক্ততার কথাও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে অ্যাম্বার আইটির বিরুদ্ধে অতীতে অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রমে সহায়তার অভিযোগে প্রশাসনিক জরিমানার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স বিতর্ক শুধু মালিকানা বা রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। লাইসেন্স পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনটি পৃথক লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান নিজেদের মধ্যে যৌথ কনসোর্টিয়াম গঠন করেছে। অথচ প্রচলিত সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্সিং গাইডলাইনে পৃথক লাইসেন্সধারীদের এমন যৌথ কাঠামো তৈরির স্পষ্ট বিধান নেই বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিন প্রতিষ্ঠান একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউর মাধ্যমে যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেয় এবং সেটি বিটিআরসি চেয়ারম্যানের অনুমোদন পায়। সমালোচকদের মতে, পৃথক লাইসেন্স থাকার পর যদি প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত একটি ব্যবসায়িক কাঠামোর মতো পরিচালিত হয়, তাহলে বাজার প্রতিযোগিতা ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এ ছাড়া লাইসেন্সের কারিগরি শর্ত পূরণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট গাইডলাইন অনুযায়ী তিন প্রতিষ্ঠানের মোট ছয়টি ফাইবার পেয়ার স্থাপনের বাধ্যবাধকতা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় তিনটি ফাইবার পেয়ার কম স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সংযোগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী পূর্ব ও পশ্চিম—দুই দিকেই আন্তর্জাতিক সংযোগ স্থাপনের কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে কক্সবাজার থেকে সিঙ্গাপুরমুখী পূর্ব রুট বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যমুখী পশ্চিম রুট স্থাপন করা হয়নি বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে লাইসেন্সের শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
বাজার প্রতিযোগিতার ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। একটি আইআইজি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সাবমেরিন ক্যাবল, আইটিসি, আইআইজি, এনটিটিএন ও আইএসপি খাতে উপস্থিতি বাজারের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করছে। এতে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তার দাবি।
লাইসেন্স প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নের বিষয়ে ফাইবার অ্যাট হোমের সিইও সুমন আহমেদ সাব্বিরও প্রক্রিয়াটি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, লাইসেন্স দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া সঠিক ছিল কি না, সেটি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। ফলে অভিযোগগুলোর আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা যাচাই হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য থেকে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
সাবমেরিন ক্যাবল কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক অবকাঠামো নয়। দেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগের পাশাপাশি এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং বৈদেশিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। তাই লাইসেন্স প্রদান, মালিকানা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, বিনিয়োগ, রুট নির্বাচন এবং পরিচালনা—প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট গাইডলাইন, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, মালিকানা কাঠামো, বিটিআরসির অনুমোদন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নথি স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। আর অভিযোগের কোনো অংশ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য ও নথির মাধ্যমে তা পরিষ্কার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর। সাবমেরিন ক্যাবল খাতে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাবের অভিযোগ থাকলে তা শুধু একটি লাইসেন্স বিতর্ক নয়; বরং বাজারের প্রতিযোগিতা, জাতীয় স্বার্থ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। তাই এই খাতের লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক ছিল, তা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।