রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন না হলে যে-ই ক্ষমতায় আসুক, স্বৈরশাসকে পরিণত হবে: মামুনুল হক - Uttorpatro TV

রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন না হলে যে-ই ক্ষমতায় আসুক, স্বৈরশাসকে পরিণত হবে: মামুনুল হক

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: September 10, 2026

দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন না হলে ক্ষমতায় যে দল বা ব্যক্তি আসুক, একসময় তার স্বৈরশাসকে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তাঁর মতে, শুধু সরকার বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তি পরিবর্তন করলেই রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না; এর জন্য রাষ্ট্রের বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোতেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।

বৃহস্পতিবার শরীয়তপুর পৌরসভার মাঠ প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শরীয়তপুর জেলা শাখা আয়োজিত এক নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সমাবেশে মামুনুল হক দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, এই কাঠামোর মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় গেলে পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন ব্যক্তির মধ্যেও স্বৈরাচারী প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ব্যক্তি পরিবর্তনের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতেও সংস্কার প্রয়োজন।

মামুনুল হক তাঁর বক্তব্যে বলেন, বর্তমানে দেশে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান, সেটি বহাল রেখে শুধু ক্ষমতার হাতবদল করলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তাঁর ভাষায়, ‘লঙ্কায় গেলেই হনুমান হবে’—অর্থাৎ বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রভাব থেকে কেউ সহজে বেরিয়ে আসতে পারবেন না। তাঁর আশঙ্কা, যিনি আজ ক্ষমতায় যাবেন, কয়েক বছর পর তিনিও একই ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে যেতে পারেন।

নাগরিক সমাবেশে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়ে একাধিক দাবি তুলে ধরেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির। এর মধ্যে অন্যতম ছিল গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। পাশাপাশি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদও জানানো হয়।

রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য দেন মামুনুল হক। তিনি বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রপতির পদ অনেকটাই আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, জুলাই বিপ্লবের চেতনা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির হাতে বাস্তবসম্মত কিছু প্রশাসনিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। মামুনুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্ব থেকে বিচার বিভাগকে বের করে আনতে হবে। এ জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিচার বিভাগকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। তিনি এমন একটি বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দেন, যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব বিচারিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারে এবং বিচারপতিরা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানান মামুনুল হক। তিনি বলেন, দেশের সব রাজনৈতিক দল যদি কোনো কারণে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে সরে যায়, তাহলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রয়োজনে একাই জনগণের কাছে গিয়ে এ দাবির পক্ষে জনমত গড়ে তুলবে।

তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা না গেলে দেশে আবারও ফ্যাসিবাদী শাসন ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

মামুনুল হক বলেন, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আধিপত্যবাদ মেনে নেওয়া হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শরীয়তপুর জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা শাব্বির আহমেদ ওসমানী সভাপতিত্ব করেন। এতে দলের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া ময়মনসিংহ-২ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মুহাম্মাদুল্লাহ, মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ উদ্দিন আহমদ হানজালা, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুর রহমান হেলাল এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য নূর হোসাইন নূরানীসহ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন।

সমাবেশে বক্তারা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দ্রব্যমূল্যসহ জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। বিশেষ করে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

মামুনুল হকের বক্তব্যে মূলত রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন, ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া শুধু সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন।

শরীয়তপুরের নাগরিক সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতারা এসব দাবি তুলে ধরার পাশাপাশি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের আহ্বান জানান। সমাবেশে দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল।