অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং সংগঠন করার অধিকার সংকুচিত হয়েছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা আইনি হয়রানি ও নির্বিচার গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছেন। এমনকি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে।
গত ২১ এপ্রিল নিজস্ব ওয়েবসাইটে ‘বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে লন্ডনভিত্তিক এই সংস্থাটি। প্রতিবেদনে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত তুলে ধরার ক্ষেত্রে নাগরিকরা বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইনটি ২০২৫ সালে অধ্যাদেশ হিসেবে সংশোধন হওয়ার আগ পর্যন্ত এর প্রয়োগ অব্যাহত ছিল। এই আইনের মাধ্যমে সাংবাদিক, লেখক, কবি, ব্লগার এবং মানবাধিকারকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভিন্নমত দমনে সহিংসতা ও গ্রেপ্তারের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে সংস্থাটি সাংবাদিক আনিস আলমগীরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি সামনে এনেছে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক করা হয়। তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল। অ্যামনেস্টি এই ধরনের গ্রেপ্তারকে বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে।
প্রতিবেদনের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর হামলার বিবরণ। সংস্থাটি জানায়, গত ১৮ ডিসেম্বর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর সংবাদকে কেন্দ্র করে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই সময় বিক্ষুব্ধ জনতা দেশের প্রভাবশালী দুটি দৈনিক—প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে চড়াও হয় এবং সেখানে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
হামলার তালিকায় আরও ছিল ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’-এর নাম। পত্রিকাটির সম্পাদক নূরুল কবীরকে হয়রানি করার বিষয়টি প্রতিবেদনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়া দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ ভবনেও হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে থাকা দেশে সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর এমন আক্রমণ মুক্তচিন্তা ও গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারকে নাগরিক অধিকার সমুন্নত রাখা এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।