কোটি টাকার স্কলারশিপ পেলেন ববি শিক্ষার্থী হৃদয় - Uttorpatro TV

কোটি টাকার স্কলারশিপ পেলেন ববি শিক্ষার্থী হৃদয়

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: September 11, 2026
ছবিঃ সংগৃহীত

ববি প্রতিনিধি:

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. হৃদয় হাওলাদার যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটিতে ‘পলিটিকস’ বিষয়ে পিএইচডির সুযোগ পেয়েছেন। পিএইচডির জন্য তিনি পেয়েছেন Newcastle University Overseas Research Scholarship (NUORS) এবং Teaching Assistantship (TA)। তার গবেষণায় আয়ারল্যান্ডের Queen’s University Belfast-এর যৌথ তত্ত্বাবধানও থাকবে।

স্কলারশিপের আওতায় সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির পার্থক্য কভার করা হবে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ টাকার ফেলোশিপ পাবেন হৃদয়।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন হৃদয়। বিভাগটি প্রতিষ্ঠার পর পিএইচডির সুযোগ পাওয়া প্রথম শিক্ষার্থীও তিনি। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির এই স্কলারশিপে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

গবেষণায় আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ

পিএইচডির সুযোগ পাওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন হৃদয়। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অভিবাসন ও শরণার্থী অধ্যয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শাসন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশ রাজনীতি তার গবেষণার আগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র।

ভারত-বাংলাদেশের পানি বিরোধের ভূরাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক প্রভাব, রোহিঙ্গা সংকট, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জলনিরাপত্তা ও জলবায়ু রাজনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি।

তার উল্লেখযোগ্য গবেষণা “The Rohingya Crisis in Bangladesh: Challenges and Prospects” বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্প্রিংগারের ‘ডিসকভার গ্লোবাল সোসাইটি’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এতে রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাবের পাশাপাশি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

জলবায়ু ও পানিনিরাপত্তা নিয়েও কাজ করেছেন হৃদয়। “Hydrological Hegemony and US Strategic Engagement in Climate and Water Security” গবেষণায় জলনিরাপত্তা, জলবায়ু ঝুঁকি, অভিবাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পৃক্ততা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া “US-China Rivalry and the Future of Global Security” গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ও ফাইভজি প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এবং এর বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ওপর প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।

“Assessing Geopolitical and Socio-Economic Consequences of India-Bangladesh Water Disputes” শিরোনামের গবেষণায় আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।

ইউরোপ থেকে দেশে ফিরে গবেষণায় মনোযোগ

উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে এর আগে ডেনমার্কের Aalborg University-তে MSc in International Relations and Global Refugee Studies-এ ভর্তি হন হৃদয়। সে সময় মাস্টার্স শেষ করে উত্তর আমেরিকায় পিএইচডি করার পরিকল্পনা ছিল তার।

তবে ডেনমার্কে যাওয়ার পর কাজের অনিশ্চয়তা, সিপিআর-সংক্রান্ত জটিলতা এবং বিভিন্ন বাস্তব পরিস্থিতি তার একাডেমিক পরিকল্পনায় বাধা তৈরি করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

হৃদয় বলেন, অর্থ উপার্জন কখনো তার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল না। গবেষণা, উচ্চশিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক ক্যারিয়ার গড়াই ছিল তার মূল লক্ষ্য। এ কারণে ইউরোপে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়ে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

Aalborg University-এর নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভর্তি বাতিল করায় টিউশন ফির ৭৫ শতাংশ ফেরত পাওয়ার সুযোগও ছিল তার। দেশে ফিরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের চূড়ান্ত পরীক্ষাও শেষ করেন তিনি।

এরপর নিজের একাডেমিক প্রোফাইল শক্তিশালী করতে গবেষণায় মনোনিবেশ করেন হৃদয়। ডেস্কভিত্তিক গবেষণার পাশাপাশি সুন্দরবনে মাঠপর্যায়ে গবেষণা করেন। তথ্য সংগ্রহ, গবেষণাপত্র লেখা ও সংশোধন এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে কাজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের একাডেমিক অবস্থান শক্ত করেন তিনি।

প্রতিকূলতার মধ্যেও পরিবারের সমর্থন

দেশে ফেরার পর একাডেমিক কাজের পাশাপাশি নানা সামাজিক প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে জানান হৃদয়। তার সাময়িক ও কৌশলগত দেশে ফেরাকে অনেকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখেছিলেন। এ কারণে তার পরিবারকেও নানা কথা শুনতে হয়েছে।

তবে কঠিন সময়ে পরিবারের সদস্যরা তার পাশে ছিলেন। বাবা-মা, ভাই-বোন, শিক্ষক, পরামর্শদাতা, সহকর্মী ও বন্ধুদের সহযোগিতাকে নিজের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছেন তিনি।

গবেষণার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রকাশনা ও একাডেমিক কাজেও যুক্ত হয়েছেন হৃদয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তার একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধারাবাহিক কাজের মাধ্যমে নিজের একাডেমিক অবস্থানও শক্তিশালী করেছেন তিনি।

নতুন লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যে যাত্রা

এবার যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি শুরু করতে যাচ্ছেন হৃদয় হাওলাদার। তার কাছে এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এর পেছনে রয়েছে পরিবারের ত্যাগ, শিক্ষক-পরামর্শদাতাদের সহযোগিতা এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকা মানুষদের বিশ্বাস।

নতুন একাডেমিক যাত্রার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি। গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি একজন দায়িত্বশীল ও বিনয়ী গবেষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলাই এখন তার লক্ষ্য।