গ্যাসের অভাবে বন্ধ সিরামিক কারখানা, চাকরি হারালেন ১৩ কর্মী - Uttorpatro TV

গ্যাসের অভাবে বন্ধ সিরামিক কারখানা, চাকরি হারালেন ১৩ কর্মী

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 14, 2026

দীর্ঘ ২২ বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা একটি সিরামিক ব্যবসা এখন গ্যাস সংকটে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। বিদেশ থেকে বড় রপ্তানি আদেশ হাতে থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে উৎপাদন চালিয়ে যেতে না পেরে কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন ক্লে ইমেজের স্বত্বাধিকারী রেহানা আক্তার। কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কাজ করা ১৩ জন অভিজ্ঞ কর্মী।

রেহানা আক্তারের ভাষ্য, হাতে তৈরি মাটির সিরামিক পণ্য তৈরিতে দীর্ঘদিন ধরে সুনাম অর্জন করেছে তাঁর প্রতিষ্ঠান। দেশের বাজারের পাশাপাশি এসব পণ্যের চাহিদা বিদেশেও তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ গত জুন মাসে চীন থেকে প্রায় দুই বছরের জন্য বড় একটি রপ্তানি ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর ব্যবসা আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাই এখন গ্যাস সংকটে থমকে গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ছোট কারখানায় প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০টি সিরামিক পণ্য তৈরি করা সম্ভব। তবে এই উৎপাদন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি হলো ফায়ারিং বা উচ্চ তাপে পণ্য পোড়ানো। আর এই কাজের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত গ্যাস। গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘদিন ধরে সংকট থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম ধীরে ধীরে ব্যাহত হতে থাকে।

উদ্যোক্তার দাবি, ২০২৪ সালের পর থেকেই কারখানায় পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ প্রায় নেই বললেই চলে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প হিসেবে সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন তিনি। এ জন্য তাঁকে প্রায় ১০ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হয়েছে।

কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থাটিও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গত প্রায় ছয় মাস ধরে সিএনজি সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছিল না। উদ্যোক্তার অভিযোগ, বড় শিল্পকারখানাগুলোতে সরবরাহ দেওয়ার পর যে পরিমাণ গ্যাস অবশিষ্ট থাকত, তা ছোট শিল্পের জন্য দেওয়া হতো। শেষ পর্যন্ত কয়েক দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়।

রেহানা আক্তার জানান, গ্যাস পাওয়ার আশায় একপর্যায়ে তিনি ১ লাখ টাকা অগ্রিমও দিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থ পরিশোধের পরও প্রয়োজনীয় গ্যাস পাওয়া যায়নি। ফলে কারখানার ফায়ারিং কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ছয় মাস ধরে কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব হয়নি। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কর্মীদের বেতনসহ প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ব্যয় চালিয়ে যেতে হয়েছে। উদ্যোক্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতদিন প্রতিষ্ঠানে থাকা পণ্য বিক্রি করে এবং ব্যাংকে থাকা আমানতের অর্থ ভেঙে কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়েছে।

তবে এভাবে দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। একদিকে উৎপাদন ও আয় বন্ধ, অন্যদিকে ব্যাংকঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে। নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো আর্থিক সক্ষমতাও শেষ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে কয়েক দিন আগে কারখানাটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন উদ্যোক্তা।

এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ১৩ জন অভিজ্ঞ কর্মীকে বিদায় দিতে হয়েছে। এসব কর্মীকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রশিক্ষণ ও কাজের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা হয়েছিল বলে জানান উদ্যোক্তা। কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, এর সঙ্গে যুক্ত কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রেহানা আক্তারের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গ্যাসের মতো মৌলিক জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হলে ছোট উদ্যোক্তাদের পক্ষে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বড় শিল্পের তুলনায় এসএমই উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা কম হওয়ায় বিকল্প জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরের সুযোগও সীমিত।

বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের অনেককে এলপিজিতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে রেহানা আক্তারের প্রশ্ন, একটি ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে নতুন জ্বালানি ব্যবস্থায় কীভাবে যাবে? দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় যেখানে প্রতিষ্ঠানের আয় প্রায় শূন্য, সেখানে নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

এ অবস্থায় গ্যাস সংকটের পাশাপাশি আর্থিক চাপও বাড়ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় নতুন আয় হচ্ছে না, অথচ ব্যাংকঋণের কিস্তি, প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য দায় এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখার খরচ বহন করতে হচ্ছে। ফলে ব্যবসা পুনরায় চালু করার আগেই প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

সবচেয়ে হতাশার বিষয় হিসেবে রেহানা আক্তার উল্লেখ করেন, বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে বড় রপ্তানি আদেশ পাওয়ার পরও তিনি তা কাজে লাগাতে পারছেন না। চীনের বাজারে পণ্য পাঠানোর সুযোগ তৈরি হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকায় সেই সম্ভাবনা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

তাঁর মতে, একটি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বছরের পর বছর সময়, শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও মৌলিক অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকলে সেই প্রতিষ্ঠান অল্প সময়েই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের সময়ে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ব্যাংকঋণের কিস্তিতে সাময়িক সুবিধা, বিশেষ তহবিল কিংবা সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছেন।

রেহানা আক্তারের বক্তব্য, বিদেশ থেকে ক্রয়াদেশ হাতে থাকার পরও শুধু জ্বালানি সংকটের কারণে কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া উদ্যোক্তা ও দেশের অর্থনীতি—উভয়ের জন্যই হতাশাজনক। তাঁর মতে, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় এখন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

গ্যাস সংকটের কারণে ক্লে ইমেজের মতো একটি ছোট সিরামিক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঘটনা এসএমই খাতের জ্বালানি নির্ভরতার বিষয়টিও সামনে এনেছে। উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ, বিকল্প জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং সংকটকালীন ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো আবার উৎপাদনে ফিরতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তা সংশ্লিষ্টরা।