কাপাসিয়া উপজেলা সদরের রাউৎকোনা গ্রামের বাড়িটি থেকে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করার সেখানে ভিড় জমাচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীরা। রোববার দুপুরে ছবি: প্রথম আলো

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা সদরের রাউৎকোনা গ্রামে একটি সাধারণ ভাড়া বাড়ি এখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। একই ঘর থেকে গৃহবধূ, তাঁর তিন শিশুসন্তান এবং আপন ভাইয়ের নিথর দেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঘটনার কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও মূল অভিযুক্ত গৃহকর্তা ফোরকান মিয়া (৪০) এখনো পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদিকে ফরেনসিক ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আলামত সংগ্রহ করলেও ঘটনার নৃশংসতা ভাবিয়ে তুলছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় দোকানি আবদুর রশিদের ভাষ্যমতে, শুক্রবার রাতেও পরিস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। রাত ৮টার দিকে ফোরকান তাঁর দুই শিশুকন্যা ফারিয়া ও উম্মে হাবিবাকে নিয়ে রশিদের দোকানে আসেন। সন্তানদের জন্য তিনি নিজ হাতে চিপস ও চকলেট কিনে দেন। কোনো অস্বাভাবিকতা তখন লক্ষ্য করা যায়নি। তবে সেই রাতের কয়েক ঘণ্টা পরই ঘটে যায় ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য হত্যাকাণ্ড। দোকানি আক্ষেপ করে বলেন, “বাবা যদি সন্তানদের ঘাতক হয়, তবে দুনিয়াতে নিরাপদ জায়গা আর কোথায়?”
শনিবার ভোরে যখন পুলিশ ও স্থানীয়রা বাড়িতে প্রবেশ করে, তখন ভেতরকার দৃশ্য ছিল বর্ণনাতীত বীভৎস। স্থানীয় এক নারী বাসিন্দা জানান, ঘরের ভেতরে জানালার গ্রিলের সঙ্গে গৃহবধূ শারমিনের দুই হাত বাঁধা ছিল। তাঁর মুখে কাপড় ও টেপ প্যাঁচানো ছিল এবং দেয়ালে রক্তের ছাপ লেগে ছিল। খুনি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিহতরা হলেন— শারমিন আক্তার (৩০), তাঁর তিন মেয়ে মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (২) এবং শারমিনের ছোট ভাই রসুল মিয়া (২২)।
নিহত শারমিনের স্বজনদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান তাঁর ভাইকে ফোন করে দম্ভভরে বলেন, “সবাইকে মেরে ফেলেছি, আমাকে আর পাবি না।” এরপর থেকেই তাঁর ফোন বন্ধ। ফোরকান পেশায় একজন প্রাইভেট কার চালক এবং দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে কাপাসিয়ায় সপরিবারে ভাড়া থাকতেন।
পুলিশ তদন্তে নেমে ঘর থেকে একটি লিখিত অভিযোগপত্র উদ্ধার করেছে। টাইপ করা ওই কাগজে ফোরকান তাঁর স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং স্ত্রীর অন্য সম্পর্কের অভিযোগ তুলেছেন। তবে শারমিনের পরিবারের দাবি, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। মূলত ফোরকান দ্বিতীয় বিয়ে করতে চেয়েছিলেন এবং এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় আগে থেকেই শারমিনের ওপর নির্যাতন চালাতেন। কয়েক মাস আগে মারধরের শিকার হয়ে শারমিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। পরে ফোরকান ক্ষমা চেয়ে তাঁকে আবারও কাপাসিয়ায় নিয়ে আসেন।
কাপাসিয়া থানা পুলিশ জানিয়েছে, আসামিকে গ্রেপ্তারে সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো হচ্ছে। রোববার সকালে ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছে। স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা এই নৃশংস ঘটনার দ্রুত বিচার এবং ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
গাজীপুরের এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডটি কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক সম্পর্কের ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। পুলিশি অভিযানে ফোরকান গ্রেপ্তার হলে এই গণহত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।