হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাস শেষ হওয়ার পরও বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি কার্গো সরবরাহ করতে পারবে না বলে জানিয়েছে কাতারএনার্জি। একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছে পাকিস্তান ও ইউরোপের কয়েকটি দেশও।
জ্বালানি সরবরাহে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ কাতারের এলএনজি রপ্তানি কার্যক্রমে এই সংকট তৈরি হয়েছে মূলত হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান নৌপথ এই প্রণালি। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও এর প্রভাব পড়ছে।
কাতারএনার্জির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে সরবরাহের ক্ষেত্রে ‘ফোর্স মেজার’ বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা পূরণে ছাড়ের সময়সীমা সেপ্টেম্বরের পর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, কাতার থেকে এলএনজি আমদানিকারক আরও কয়েকটি দেশ একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। পাকিস্তানকে অক্টোবর পর্যন্ত এলএনজি কার্গো বাতিলের বিষয়ে জানানো হয়েছে। ইউরোপের কয়েকজন ক্রেতাকেও সরবরাহ স্থগিতের নোটিস দেওয়া হয়েছে।
ইতালির জ্বালানি কোম্পানি এডিসন শুক্রবার জানিয়েছে, কাতারএনার্জি তাদের আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো সরবরাহ স্থগিত করার কথা জানিয়েছে। এসব চালান সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ইতালির অ্যাড্রিয়াটিক এলএনজি টার্মিনালে পৌঁছানোর কথা ছিল।
এর ফলে কাতারের এলএনজি সরবরাহ সংকট যে শুধু এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ইউরোপের জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে—এমন চিত্র উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর গত ৪ মার্চ কাতারএনার্জি তাদের এলএনজি কার্যক্রম স্থগিত করে ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণা করে। এরপর হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় সেই সিদ্ধান্ত একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে।
কাতারের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির এলএনজি রপ্তানির বড় অংশ এই সামুদ্রিক পথ ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছায়। ফলে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে কাতারের পক্ষে নিয়মিত রপ্তানি চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের এলএনজি সরবরাহ করতে না পারার ক্ষেত্রে কাতারএনার্জি নিয়ন্ত্রণের বাইরের পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে।
এলএনজি সরবরাহ সংকটের পেছনে শুধু হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সমস্যা নয়, কাতারের নিজস্ব জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতিও বড় ভূমিকা রাখছে।
মার্চে কাতারের রাস লাফান জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই হামলার পর কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী এবং দেশটির জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছিলেন, হামলার ফলে কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা প্রায় ১৭ শতাংশ কমে গেছে।
অর্থাৎ উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামোর ক্ষতি এবং পরিবহনপথের নিরাপত্তা—দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়েছে কাতারের এলএনজি খাত।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় জুলাইয়ে। ওই সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় কাতারের একটি এলএনজি ট্যাংকার ‘আল রেক্কায়াত’ হামলার শিকার হয়। হামলার ঘটনায় জাহাজটির বাম পাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে জাহাজে থাকা ক্রুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
কাতার ওই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে। ঘটনার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে কাতারের এলএনজি পরিবহন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে নিয়মিত এলএনজি পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এতে আন্তর্জাতিক বাজারে কাতারের সরবরাহ সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। কারণ কাতার বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি রপ্তানিকারকদের একটি এবং এশিয়া ও ইউরোপের বহু দেশ তাদের জ্বালানি চাহিদার একটি অংশ পূরণ করে কাতারের সরবরাহ থেকে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস স্টাডিজের (আইসিস) তথ্যের বরাত দিয়ে ইউরোনিউজ জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে দেশটি ৫০৯টি কার্গো রপ্তানি করেছিল।
দুটি সময়ের পরিসংখ্যানের পার্থক্য কাতারের এলএনজি রপ্তানি ব্যবস্থায় সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে। কয়েকশ কার্গোর জায়গায় মাত্র কয়েক ডজন চালান রপ্তানি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে কাতারের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কাতারের জ্বালানি আয়ের ওপরও। তথ্য অনুযায়ী, এলএনজি বিক্রি থেকে দেশটির আয় প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার কমেছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা দীর্ঘদিন ধরেই বেশি। দেশীয় গ্যাসের পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজি সেই চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কাতারের মতো বড় সরবরাহকারীর কাছ থেকে এলএনজি কার্গো সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন তৈরি হলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন খাতে এলএনজি সরবরাহের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহ, স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কেনা কিংবা বিদ্যমান মজুত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের ওপর সংকটের সুনির্দিষ্ট প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়—এসব বিষয়ের ওপর।
কাতারএনার্জির সরবরাহ স্থগিতের সময়সীমা সেপ্টেম্বরের পরও বাড়ানোর ঘটনায় বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ পরিকল্পনা নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে পাকিস্তান ও ইউরোপের ক্রেতারাও বিকল্প সরবরাহের পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে কাতারের এলএনজি রপ্তানি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে। তবে অবকাঠামোর ক্ষতি, ট্যাংকার চলাচলের ঝুঁকি এবং সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরবরাহ উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং বিকল্প আমদানি ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক কোনো একটি রুট বা সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রভাব সরাসরি দেশের জ্বালানি বাজারে এসে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
সূত্র: দোহা নিউজ