জামায়াত নেতার বাড়ি থেকে খাদ্য অধিদপ্তরের ৯৯ বস্তা সরকারি চাল জব্দ - Uttorpatro TV খাদ্য অধিদপ্তরের সিলযুক্ত চাল জামায়াত নেতার পরিত্যক্ত ঘরে! সুবর্ণচরে তুলকালাম

জামায়াত নেতার বাড়ি থেকে খাদ্য অধিদপ্তরের ৯৯ বস্তা সরকারি চাল জব্দ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ১৭, ২০২৬
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার জামায়াত নেতার বাড়িতে পাওয়া খাদ্য অধিদপ্তরের সিলযুক্ত চালের বস্তা। আজ দুপুরে চর জব্বর ইউনিয়নের ইমানআলী বাজার এলাকায় ছবি: উত্তরপত্র টিভি।

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় এক জামায়াতে ইসলামী নেতার বাড়ি থেকে খাদ্য অধিদপ্তরের সিলমোহরযুক্ত বিপুল পরিমাণ সরকারি চাল জব্দ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। শনিবার দুপুরে উপজেলার চরজব্বর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ঈমান আলী বাজার সংলগ্ন এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর অভিযান চালানো হয়। উদ্ধারকৃত চালের বস্তাগুলোতে স্পষ্ট সরকারি সিল রয়েছে, যা নিয়ম অনুযায়ী খোলা বাজারে কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

অভিযুক্ত ওই নেতার নাম আবদুস সামাদ। তিনি স্থানীয় চরজব্বর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, জামায়াত নেতা আবদুস সামাদের বসতবাড়ির ভেতরে একটি পরিত্যক্ত ঘরের মধ্যে বিপুল পরিমাণ চালের বস্তা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। হঠাৎ করেই স্থানীয় লোকজন বিষয়টি টের পান এবং ঘরের ভেতর খাদ্য অধিদপ্তরের সিলযুক্ত চালের বস্তা দেখতে পান। সরকারি চাল এভাবে ব্যক্তিগত ঘরে মজুত রাখার খবর মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত স্থানীয় বাসিন্দারা ওই বাড়িটি ঘেরাও করেন।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি সুবর্ণচর উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়। খবর পেয়ে সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আকিব ওসমান পুলিশ ফোর্স নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এরপর পুলিশ ও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে ওই পরিত্যক্ত ঘরে তল্লাশি চালিয়ে মোট ৯৯ বস্তা চালের সন্ধান মেলে। পরবর্তীতে ইউএনওর নির্দেশে চালগুলো স্থানীয় চরজব্বর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

চরজব্বর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কাউছার আহম্মেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ওই জামায়াত নেতার বাড়ি থেকে মোট ৯৯ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে তল্লাশি ও জব্দের প্রক্রিয়া চলার আগেই বাড়ির লোকজন চার বস্তা চালের মুখ খুলে ফেলেছিল। যার কারণে ওই উন্মুক্ত চার বস্তা চাল আপাতত বাদ দিয়ে বাকি ৯৫ বস্তা সিলগালা চাল সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় জব্দ করে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের হেফাজতে নিয়ে আসা হয়েছে।

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরও জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়ার পরপরই পরিষদের গ্রাম পুলিশ ও চৌকিদারদের সহায়তায় চালগুলো নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া হয়। বর্তমানে অভিযুক্ত আবদুস সামাদকে এই চালের স্বপক্ষে বৈধ ও সরকারি কাগজপত্র দেখানোর জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাগজপত্র জমা দিলে তা যাচাই করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা আবদুস সামাদ চাল চুরির বা অবৈধ মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, এই চালগুলো অবৈধ উপায়ে সংগ্রহ করা হয়নি। তাঁর ভাই পার্শ্ববর্তী লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার তিনটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে এই চালগুলো কিনেছিলেন। তবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দকৃত চাল কীভাবে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে তাঁর পরিত্যক্ত ঘরে এল, সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

অন্যদিকে, সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আকিব ওছমান গণমাধ্যমকে বলেন, বাড়ির মালিকের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে চালগুলো লক্ষ্মীপুরের রামগতি এলাকার তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি বিশেষ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, সরকারি কোনো কর্মসূচির চাল এভাবে ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো পরিত্যক্ত বাড়িতে লুকিয়ে রাখা কিংবা কেনাবেচা করার কোনো আইনি সুযোগ নেই।

ইউএনও আরও স্পষ্ট করেন যে, প্রাথমিকভাবে এই চালগুলো সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ওই বাড়িতে রাখা হয়েছে বলেই প্রমাণিত হচ্ছে। এরপরও আমরা তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়েছি এবং প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাগজপত্র জমা দিতে বলেছি। যদি তারা উপযুক্ত এবং আইনসম্মত কোনো প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হন, তবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সুবর্ণচরের এই ঘটনার পর থেকে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি ত্রাণের বা বিশেষ বরাদ্দের চাল কীভাবে অন্য জেলা থেকে এসে রাজনৈতিক নেতার ঘরে মজুত হলো, তা খতিয়ে দেখতে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।