১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান, মসনদে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দুত্ববাদের জয় - Uttorpatro TV ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান, মসনদে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দুত্ববাদের ...

১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান, মসনদে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দুত্ববাদের জয়

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ৫, ২০২৬
ছবি- অনলাইন থেকে সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে ঘটে গেল এক ঐতিহাসিক ও অভাবনীয় ওলটপালট। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে নীল-সাদা প্রাসাদের দখল নিল গেরুয়া শিবির। সোমবার ভোট গণনার শেষে দেখা যায়, পরিবর্তনের যে চোরাস্রোত গত কয়েক বছর ধরে বইছিল, তা কার্যত সুনামিতে পরিণত হয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ঘাসফুল শিবিরকে। ২৯৪ আসনের মধ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০৬টি আসনে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করেছে। অন্যদিকে, শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৭৮টি আসনে জয়ী হতে সমর্থ হয়েছে।

এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল ভবানীপুর কেন্দ্র। নিজের খাসতালুকে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৬ রাউন্ড গণনা শেষে ২,৯৫৬ ভোটে পিছিয়ে থাকার পর একসময় গণনা থমকে যায় এবং উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

বিজেপির এই বিশাল জয়ের পর দিল্লির মঞ্চে এক ভিন্নরূপে ধরা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ধুতি-পাঞ্জাবি পরে পুরোদস্তুর বাঙালি বেশে তিনি ‘সোনার বাংলা’ গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি একে ‘সুশাসনের রাজনীতির জয়’ বলে অভিহিত করেছেন।

বিজেপির জয়ের ৫টি প্রধান কারণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির এই সাফল্যের পেছনে সুপরিকল্পিত পাঁচটি কৌশল কাজ করেছে:

  1. ধর্মীয় মেরুকরণ: অনুপ্রবেশ ও রোহিঙ্গা ইস্যুকে সামনে রেখে হিন্দু ভোটব্যাংক একজোট করতে সফল হয়েছে বিজেপি। শুভেন্দু অধিকারীর কট্টর হিন্দুত্ববাদ ও অমিত শাহর অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রতিশ্রুতি এখানে নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছে।

  2. প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা (Anti-Incumbency): দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে নিয়োগ দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং তৃণমূল নেতাদের ‘দাদাগিরি’ ও ‘তোলাবাজি’র বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ব্যালট বাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে।

  3. রণকৌশল পরিবর্তন: ‘বহিরাগত’ তকমা ঝেড়ে ফেলতে শমীক ভট্টাচার্যকে রাজ্য সভাপতি করা এবং ‘দিদি ও দিদি’র মতো ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে সরে এসে প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া ছিল বিজেপির মাস্টারস্ট্রোক।

  4. নারী ও সরকারি কর্মচারীদের সমর্থন: নারী সংরক্ষণ বিল এবং বকেয়া ডিএ মেটানোর প্রতিশ্রুতি রাজ্যের বিশাল সংখ্যক নারী ভোটার ও সরকারি কর্মীদের বিজেপির দিকে টেনেছে।

  5. ভোটার তালিকা সংশোধন: নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন’ (এসআইআর)-এর মাধ্যমে প্রায় ২৭ লাখ ভুয়া নাম বাদ পড়ায় স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত হয়েছে বলে মনে করছে বিজেপি।

সারাদেশে নির্বাচনী হাওয়া: কেরালা-তামিলনাড়ুতেও পতন

শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারতের আরও চার রাজ্যে নির্বাচনের ফলাফল ছিল চমকপ্রদ:

  • তামিলনাড়ু: দক্ষিণী মেগাস্টার বিজয় থালাপাতির দল ‘তামিলগা ভেট্টি কাজাগাম’ (টিভিকে) ১০৭টি আসন জিতে বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

  • কেরালা: দীর্ঘ ৫০ বছর পর কেরালায় বাম দুর্গের পতন ঘটেছে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ ৯৯টি আসনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরছে।

  • আসাম ও পুদুচেরি: আসামে ১০২টি এবং পুদুচেরিতে ১৮টি আসন জিতে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রেখেছে এনডিএ জোট।

উত্তপ্ত বাংলা: সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

ফল প্রকাশের সাথে সাথেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক সংঘর্ষ। কোচবিহারের দিনহাটা থেকে কলকাতার ভবানীপুর— সর্বত্রই তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে ধস্তাধস্তির খবর পাওয়া গেছে। মমতার গাড়ি লক্ষ্য করে ‘চোর’ স্লোগান এবং তার বাড়ির সামনে ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি দেওয়ার মতো ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য হাল ছাড়তে নারাজ। সামাজিক মাধ্যমে এক ভিডিও বার্তায় তিনি নেতা-কর্মীদের ‘বাঘের বাচ্চার মতো লড়াই’ করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন।

বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে?

বিজেপির জয়ের পর এখন বড় প্রশ্ন— কে বসছেন বাংলার মসনদে? আলোচনার দৌড়ে এগিয়ে আছেন শুভেন্দু অধিকারী, শমীক ভট্টাচার্য, দিলীপ ঘোষ এবং সুকান্ত মজুমদার। তবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আগেই স্পষ্ট করেছিলেন, বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হবেন একজন ভূমিপুত্র বাঙালিই।

বাংলার এই পরিবর্তন ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল, যার রেশ থাকবে দীর্ঘকাল।