সরকারি কর্মকর্তাদের চাপের মুখে, গাড়ির খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত এক সপ্তাহেই বাতিল - Uttorpatro TV সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ির খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার: পিছু হটল অর্থ মন্ত্রণালয়

সরকারি কর্মকর্তাদের চাপের মুখে, গাড়ির খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত এক সপ্তাহেই বাতিল

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: July 22, 2026
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট নিরসন ও সরকারি ব্যয়ে সাশ্রয় আনতে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রস্তাব করা হয়েছিল, প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ির মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে অর্ধেকের রূপ অর্থাৎ ২৫ হাজার টাকা করা হবে। কিন্তু জনপ্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের তীব্র অসন্তোষ ও আপত্তির মুখে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণ সরে আসতে হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়কে।

প্রশাসনের তীব্র ক্ষোভের পর গত ১৬ জুলাই এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বিদ্যমান ৫০ হাজার টাকাই বহাল থাকছে। এই দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পর খোদ সরকারের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে—কোনো ধরনের পূর্বালোচনা ও বিশ্লেষণ ছাড়া কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, আর কেনই-বা প্রশাসনিক চাপের মুখে তা প্রত্যাহার করতে হলো?

গত ৯ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে কর্মকর্তাদের গাড়ি সেবা নগদায়ন সুবিধা কিছুটা কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে বিপত্তি বাঁধে চিঠির ভাষা নিয়ে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, এই ভাতা কমানোর বিষয়ে সরাসরি ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ’ রয়েছে।

জনপ্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, এটি সচিবালয় নির্দেশমালা-২০১৪ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নির্দেশমালার ১৫০ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সরকারের যেকোনো আদেশে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নির্দেশনার উল্লেখ না করে ‘সরকারের সিদ্ধান্ত’ হিসেবে অভিহিত করতে হয়। চিঠিতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নাম ব্যবহারের ফলে সিদ্ধান্তের পুরো দায় ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর ওপর গিয়ে পড়ে, যা প্রশাসনিক বিধিবহির্ভূত।

কেবল গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমানোই নয়, একই দিনে (৯ জুলাই) অর্থ মন্ত্রণালয় আরও দুটি বিতর্কিত চিঠি পাঠায়:

  • সুদমুক্ত ঋণ বন্ধের প্রস্তাব: উপসচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের এতদিন যে ৩০ লাখ টাকা সুদমুক্ত গাড়ি ঋণ দেওয়া হতো, তা বন্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

  • প্রেষণ বাতিল ও শিক্ষা ছুটি: ফুল স্কলারশিপ বা ফেলোশিপ নিয়ে পড়তে যাওয়া কর্মকর্তাদের প্রেষণের (ডেপুটেশন) বদলে অর্ধেক বেতনে ‘শিক্ষা ছুটি’ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হয়।

একই দিনে সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একাধিক আর্থিক সুবিধা কাটছাঁটের এই প্রস্তাব পুরো আমলাতন্ত্রে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে দেয়।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের নীতি অনুযায়ী সরকারি পরিবহন পুলের ওপর চাপ ও পুনরাবৃত্তিক পরিচালন ব্যয় কমাতে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা দেওয়া শুরু হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশাসনে উপসচিব ও তদূর্ধ্ব স্তরের প্রায় ২,৫০০ জন কর্মকর্তা এই সুবিধা পান। এর বাইরে সশস্ত্র বাহিনীর ৩,৫০০ জন, বিচার বিভাগের ৮০০ জন এবং নির্বাচন কমিশনের ৪০০ জন কর্মকর্তাসহ প্রায় ৭,২০০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বর্তমানে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে নগদ রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা পেয়ে থাকেন। সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো ও সশস্ত্র বাহিনীতে এর প্রভাব পড়ত, যার ফলেই চারদিক থেকে জোরালো আপত্তি ওঠে।

তীব্র সমালোচনার মুখে অর্থ মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার পরপরই বলির পাঁঠা বানানো হয় অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে, যিনি ওই চিঠিগুলোতে স্বাক্ষর করেছিলেন। গত ১৯ জুলাই তাঁকে অর্থ বিভাগ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত (ওএসডি সদৃশ) করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন উঠছে—একটি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত কেবল একজন যুগ্ম সচিবের একক ইচ্ছায় নেওয়া সম্ভব নয়; এতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্মতি ছিল। তাহলে শুধু মধ্যম সারির একজন কর্মকর্তাকে সড়িয়ে দিয়ে আসল দায়িত্বপ্রাপ্তরা কীভাবে অধরা থাকেন?

এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারকে সরকারের “আমলাতন্ত্রের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ” বলে অভিহিত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশ যখন অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে, তখন সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপালেও একশ্রেণির বিশেষ সুবিধাভোগী আমলাদের অন্যায্য চাপের কাছে সরকারের এভাবে নতিস্বীকার করা অত্যন্ত হতাশাজনক ও অগ্রহণযোগ্য।

পরিস্থিতি সামাল দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে এখন দুটি প্রস্তাব নতুন করে পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে: ১. সুদমুক্ত ঋণের বিদ্যমান ব্যবস্থা চাল রাখা নাকি বন্ধ করা। ২. কর্মকর্তাদের জন্য পুনরায় সরাসরি সরকারি গাড়ি, ড্রাইভার, তেল ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা প্রদান করা হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয়ে কী প্রভাব পড়বে তার তুলনামূলক বিশ্লেষণ।

বাস্তবতা হলো, সরকার যদি কর্মকর্তাদের আবার সরাসরি পরিবহন পুল থেকে গাড়ি, জ্বালানি ও চালক সরবরাহ করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ব্যয় কমার বদলে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে এখন এক গোলকধাঁধায় পড়েছে সরকার।