তীব্র তাপপ্রবাহে রেকর্ড লোডশেডিং: বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত জনজীবন, বৈষম্যের শিকার গ্রাম - Uttorpatro TV

তীব্র তাপপ্রবাহে রেকর্ড লোডশেডিং: বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত জনজীবন, বৈষম্যের শিকার গ্রাম

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ২৩, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​সারাদেশে বইছে তীব্র তাপপ্রবাহ। রাজশাহী ও খুলনা বিভাগসহ দেশের ২৪ জেলায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। এই প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুতের চাহিদা আকাশচুম্বী হলেও জ্বালানি সংকট ও কারিগরি ত্রুটিতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে রেকর্ড লোডশেডিং। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, যা শহর ও গ্রামের মধ্যে চরম ‘বিদ্যুৎ-বৈষম্য’ তৈরি করছে।

​লোডশেডিংয়ের প্রকৃত চিত্র নিয়ে তথ্যের অমিল

​বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর তথ্যমতে, গত মঙ্গলবার রাতে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ১৬৮ মেগাওয়াট। বুধবার দিনের বেলায় তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াটে।

​তবে বিতরণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর তথ্যে ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশের বৃহত্তম বিতরণ সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) জানিয়েছে, বুধবার দুপুরে তাদের ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। আরইবির আওতাধীন অনেক এলাকায় চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৪৮ শতাংশ কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।

​উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রধান কারণসমূহ

​বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটে অর্ধেকও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়:

  • আদানি পাওয়ার: কারিগরি ত্রুটির কারণে আদানির ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ অর্ধেক (৭৫০ মেগাওয়াট) কমেছে। বকেয়া পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চিঠিও দিয়েছে।
  • জ্বালানি সংকট: কয়লার অভাবে পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটি বন্ধ। চট্টগ্রামের বাঁশখালী কেন্দ্রটিও অর্ধেকের কম উৎপাদন করছে।
  • বকেয়া ও সক্ষমতা: বিগত সরকারগুলোর রেখে যাওয়া বিপুল বকেয়ার কারণে তেল কিনতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি। ফলে ফার্নেস তেলচালিত কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

​গ্রাম বনাম শহর: প্রকট বিদ্যুৎ-বৈষম্য

​পরিসংখ্যান বলছে, লোডশেডিংয়ের পুরো দায় চাপানো হচ্ছে গ্রামের ওপর। ঢাকা (ডেসকো ও ডিপিডিসি এলাকা) এখন পর্যন্ত লোডশেডিং মুক্ত থাকলেও ময়মনসিংহে লোডশেডিং হচ্ছে ৪৮ শতাংশ। রংপুরে সরবরাহ কম ৪০ শতাংশ এবং খুলনায় ৩৯ শতাংশ।

  • জনভোগান্তি: ময়মনসিংহের তারাকান্দার এক শিক্ষক জানান, সারা দিনে ৬-৭ বার বিদ্যুৎ গিয়ে মাত্র ২০-৩০ মিনিট থাকছে।
  • শিক্ষা ও কৃষি: রংপুরে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটার অভিযোগ করেছে। অন্যদিকে, সেচ পাম্প চালাতে না পারায় বোরো ধান চাষিরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন।

​বিশেষজ্ঞদের অভিমত

​জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, “লোডশেডিংয়ের তথ্য নিয়ে সরকারের হিসাবে গরমিল আছে। লোডশেডিংয়ের পুরো চাপ গ্রামে না চাপিয়ে তা ঢাকার সাথে সমন্বয় করা উচিত। গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ সময়মতো নিশ্চিত না করায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।”

​আবহাওয়ার পূর্বাভাস

​আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বুধবার রাজশাহীতে বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার তাপপ্রবাহ কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও শুক্রবার থেকে গরম আরও বাড়তে পারে। ফলে আগামী দিনগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।