বিগত অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ১৮ মাসের শাসনামলে রাজধানী ঢাকা শহরের সার্বিক ব্যবস্থাপনার চরম ক্ষতি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। তিনি অভিযোগ করে বলেন, যারা পরিবেশ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন, তারাই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু বাস্তবে তারা পরিবেশের কোনো উন্নয়ন করতে পারেননি, উল্টো ঢাকাকে আরও বিপর্যস্ত করে গেছেন। এই ১৮ মাসে রাজধানী শহরটি অন্তত ১৮ বছর পিছিয়ে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
গতকাল রোববার (১৭ মে) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আয়োজিত ‘সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা: বন, পরিবেশ, নদী ও নগরায়ন’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল।
মো. আবদুস সালাম বলেন, অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং কার্যকর উদ্যোগের অভাবের কারণে আজ রাজধানী ঢাকা নানাবিধ সংকটে জর্জরিত। ট্রাফিক জট, হকার সমস্যা, তীব্র বায়ুদূষণ এবং নাগরিক দুর্ভোগ এখন চরম আকার ধারণ করেছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে শুধু মুখে বড় বড় কথা বললেই হবে না, বরং মাঠপর্যায়ে সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মুখে বলা সহজ হলেও বাস্তবে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন। তবে দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই কঠিন পরিস্থিতিকে সহজভাবে মোকাবেলা করে নানামুখী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন।
বায়ুদূষণ এবং শব্দদূষণ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক কেবল সেবা সংস্থাকে দায়ী না করে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এসব সংকট কেবল সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। নাগরিকদের অসচেতন আচরণও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। আমরা প্রত্যেকে যদি নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতাম, তবে ঢাকার অনেক সমস্যাই নিজে থেকেই সমাধান হয়ে যেত।
আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ১৫ দিনব্যাপী বিশেষ জরিপ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে বলে জানান আবদুস সালাম। তিনি বলেন, কোথায় কোথায় মশার লার্ভা জন্ম নিচ্ছে বা নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তা চিহ্নিত করার কাজ চলছে। একটি সাম্প্রতিক অভিযানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একটি পশু হাসপাতালের স্টাফ কোয়ার্টারের পাশে পড়ে থাকা ভাঙা টেলিভিশনের কভার ও পাত্রে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এ সময় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেন, নিজেদের বাড়িতে মশার ফ্যাক্টরি তৈরি করে পরে সিটি করপোরেশনের ওপর দোষ চাপালে চলবে না। জনগণ যদি সচেতন হয়, তবে আগামী দুবছরের মধ্যে ঢাকার চেহারা বদলে দেওয়া সম্ভব, অন্যথায় ২৫ বছরেও তা পরিবর্তন করা যাবে না।
বর্ষাকালে বিভিন্ন সেবা সংস্থার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডিএসসিসি প্রশাসক। তিনি বলেন, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে একই রাস্তা বারবার কাটতে হচ্ছে, যা জনগণের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। এই সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানে ধানমন্ডিতে একটি পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে টেলিফোন, ইন্টারনেট ও কেবল লাইনসহ সব ধরনের ঝুলন্ত তার মাটির নিচে নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই মডেল পুরো ঢাকা শহরে সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকার প্রাকৃতিক জলপথ ও খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে বড় সংকট তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্তত ১৫ থেকে ২০টি আউটলেটের মাধ্যমে ঢাকার পানি শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গায় যাওয়ার স্বাভাবিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অতীতে তা না করায় নিউমার্কেটের মতো নিচু এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই দ্রুত পানি জমে যাচ্ছে।
পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকা এখন অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত হয়েছে বলে আক্ষেপ করেন আবদুস সালাম। যেখানে ১৫-২০ লাখ মানুষের বসবাসের কথা, সেখানে এখন কোটি মানুষ ঠাসাঠাসি করে বসবাস করছে। এর ফলে হকার ও যানজট সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। ভূমিদস্যুদের দখলে নদী, খাল ও রেলপথ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীপথ ও রেলপথ উন্নত করা গেলে সড়কের ওপর চাপ এবং পরিবেশ দূষণ—দুটোই কমতো বলে তিনি মনে করেন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে কাজ চলছে জানিয়ে প্রশাসক বলেন, ভবিষ্যতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বাসা থেকেই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থাও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আসন্ন কোরবানি ঈদের প্রস্তুতি নিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, একদিনে রাজধানীতে লক্ষাধিক পশু কোরবানি হয়, যা একটি বিশাল ব্যবস্থাপনার বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার মাত্র ৮ ঘণ্টার মধ্যে পশুর সব বর্জ্য অপসারণে কাজ করবে সিটি করপোরেশন।
সবশেষে তিনি বলেন, ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য রাখতে হলে ৫০ শতাংশ দায়িত্ব জনগণের এবং ৫০ শতাংশ দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। ডাস্টবিন ও সড়কবাতি চুরির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে তিনি এলাকাভিত্তিক সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠনের আহ্বান জানান। পৃথিবীর সবচেয়ে আবর্জনাযুক্ত শহর হিসেবে ঢাকার নাম শুনতে কারো ভালো লাগে না উল্লেখ করে তিনি দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।
সভায় পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য প্রদান করেন।