শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের কফিনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দেশি-বিদেশি কর্মকর্তারা ছবি: এএফপি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সংঘাতের মাঝেই ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রধান পথপ্রদর্শক ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। আজ শুক্রবার ভোরে তেহরানের সর্ববৃহৎ জুমার নামাজ আদায়ের স্থান ‘গ্র্যান্ড মোসাল্লা’ মসজিদে তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয়। প্রধান সমাহিত কক্ষে প্রয়াত নেতার মরদেহ রাখার পর থেকেই শুরু হয় রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শেষশ্রদ্ধা নিবেদনের মূল পর্ব। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা সেখানে এসে সারিবদ্ধভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক হামলা ও যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই খামেনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই ইরান জুড়ে তীব্র শোকের ছায়া নেমে আসে।
বিশ্বনেতাদের আগমন ও পশ্চিমাদের বর্জন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আজ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার এই শেষবিদায় অনুষ্ঠানে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধিদল অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলো ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা তেহরানে এসে পৌঁছাচ্ছেন। বাঘাইয়ের তথ্যমতে, অন্তত ৮ জন দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারপ্রধান এবং ১২টি দেশের পার্লামেন্টের স্পিকার এই আনুষ্ঠানিকতায় সশরীরে উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়া অনেক দেশ তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা বিশেষ দূত পাঠিয়ে এই শোকের মুহূর্তে ইরানের পাশে থাকার বার্তা দিচ্ছে।
তবে ইরান সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকলেও, যেসব ইউরোপীয় দেশ ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাকে নীতিগতভাবে সমর্থন করেছে, তাদের এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের জাতীয় ঐক্যের ডাক রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একটি সংক্ষিপ্ত ঘরোয়া বা ব্যক্তিগত বিদায় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। সেখানে যুদ্ধে নিহত অন্যান্য ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য এবং সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের কর্মীরা উপস্থিত থেকে অশ্রুসিক্ত নয়নে খামেনিকে বিদায় জানান।
এরপরই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি আবেগঘন বার্তা শেয়ার করেন। তিনি দেশের সকল রাজনৈতিক মতাদর্শ, জাতিগত পরিচয় এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষকে এই শোকযাত্রায় শামিল হওয়ার আহ্বান জানান। পেজেশকিয়ান লেখেন, “আমাদের বীরত্বপূর্ণ জাতি যখন ইসলাম ও বিপ্লবের একনিষ্ঠ সেবককে শেষবিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমি সবাইকে ইতিহাসে স্মরণীয় সংখ্যায় এই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে আমাদের জাতীয় ঐক্য ও ইসলামি রাষ্ট্রের উচ্চ আদর্শের প্রতি অবিচল আনুগত্যের এক দৃঢ় চিত্র ফুটে উঠবে।”
দাফন প্রক্রিয়ার দীর্ঘ সূচি ও ২ কোটি মানুষের সমাগম ইরানের প্রশাসনের ধারণা, আগামী কয়েক দিন ধরে চলতে থাকা এই ধারাবাহিক বিদায় অনুষ্ঠানে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষের সমাগম ঘটতে পারে। সরকারি সূচি অনুযায়ী, শনি ও রবিবার দুদিন ধরে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ রাখা হবে। এরপর সোমবার রাজধানী তেহরানে একটি বিশাল ঐতিহাসিক শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
তেহরানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে খামেনির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ইরানের পবিত্র শহর কুমে, যেখানে বিশেষ ধর্মীয় আচার সম্পন্ন হবে। এরপর তাঁর স্মরণে ও সম্মানে ইরাকের বাগদাদ, ঐতিহাসিক কারবালা এবং নাজাফ শহরে বিশেষ স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। ইরাকের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে পুনরায় মরদেহ ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে এবং আগামী ৯ জুলাই মাশহাদে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে চূড়ান্তভাবে দাফন করা হবে। খামেনির এই মহাপ্রস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।