প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর: দ্রুত কর্মী পাঠাতে সমঝোতা স্মারক সংশোধনের তাগিদ - Uttorpatro TV মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে এমওইউ সংশোধনের প্রস্তাব বাংলাদেশের

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর: দ্রুত কর্মী পাঠাতে সমঝোতা স্মারক সংশোধনের তাগিদ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 24, 2026
ছবিঃ উত্তরপত্র

বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার উন্মুক্ত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে ঢাকা। এরই অংশ হিসেবে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) দ্রুত সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে এই আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।

আগামী ডিসেম্বরে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হতে চলায় এটি দ্রুত সংশোধন করা না হলে নতুন করে চুক্তি সই করতে হবে, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। তবে আশার কথা হলো, নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে সিন্ডিকেট বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা পুরোপুরি দূর করতে এবং অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে এনে একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একমত হয়েছে ঢাকা ও কুয়ালালামপুর।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফরে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠক শেষে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ওয়ার্কিং গ্রুপ মূলত বর্তমান বাস্তবতা ও দুই দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকটি পর্যালোচনা করবে এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরি করবে।

তবে নতুন করে চুক্তি সই করার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় বাংলাদেশ চলমান এমওইউ-এর কিছু ধারা সংশোধন করেই দ্রুত কর্মী পাঠানো শুরু করতে আগ্রহী। দেশের জনশক্তি রপ্তানিকারকদের মতে, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে পাঁচ বছর মেয়াদি যে চুক্তিটি হয়েছিল, তা চূড়ান্ত করতেই প্রায় দুই বছর আলোচনা করতে হয়েছিল। তাই বর্তমান সংকট কাটাতে সংশোধনী আনাই সবচেয়ে দ্রুততম সমাধান। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরও জানিয়েছেন যে, মালয়েশিয়ার বাজার উন্মুক্ত করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

বিগত বছরগুলোতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের নানা ধরনের প্রতারণা, প্রতিশ্রুত চাকরি ও বেতন না দেওয়া এবং অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে মালয়েশিয়াকে।

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম অত্যন্ত কড়া ভাষায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, শুধুমাত্র কোম্পানির মুনাফা বাড়াতে বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর কোনো ধরনের শোষণ বা বৈষম্যমূলক আচরণ মেনে নেওয়া হবে না। কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণ মানবিক ও সুশাসিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। আগামী মাসে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী আর. রামানান এই সুশাসন ও কর্মী কল্যাণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যেই ঢাকা সফরে আসছেন।

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার (BAIRA) সাবেক নেতৃবৃন্দের মতে, মালয়েশিয়া বিশ্বের ১৪টি দেশ থেকে কর্মী নিলেও কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই বাজারটি বারবার বন্ধ ও চালু হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বাজারটি খোলা থাকার চেয়ে বন্ধই থেকেছে বেশি। এর মূল কারণ ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের একটি শক্তিশালী আমলা ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।

২০২২ সালে বাংলাদেশ ১,৫০০ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা দিলেও মালয়েশিয়ার তৎকালীন সরকার কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই মাত্র ২৫টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেয়। বিগত আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপিদের মালিকানাধীন এই ২৫টি এজেন্সির কারণে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। সরকারের নির্ধারিত খরচ ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা হলেও, কর্মীদের কাছ থেকে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। বহু কর্মী জমিজমা বিক্রি করে মালয়েশিয়া গিয়েও কাজ পাননি, কারণ তাদের ভুয়া ডিমান্ড লেটার বা চাহিদাপত্র দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

জনশক্তি ব্যবসায়ীরা মনে করেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের মূল সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কুয়ালালামপুরে। ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস)-এর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট এবং বাংলাদেশের কিছু এজেন্সির যোগসাজশে কর্মীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। এমনকি ‘অটো রোটেশন’ পদ্ধতির মাধ্যমে চাহিদাপত্র বণ্টন করে তা কালোবাজারে বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে।

এই অনিয়ম ও সিন্ডিকেট চিরতরে বন্ধ করতে হলে চলমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সংশোধন করা জরুরি। বিশেষ করে নির্দিষ্ট এজেন্সি বাছাইয়ের নিয়ম বাতিল করে বাংলাদেশের সকল বৈধ এজেন্সির জন্য সুযোগ উন্মুক্ত করা এবং অটো রোটেশন পদ্ধতি বাতিল করলেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। ঢাকা এখন সেই লক্ষ্যেই মালয়েশিয়া সরকারের সাথে দরকষাকষি চালিয়ে যাচ্ছে।