রূপপুর প্রকল্পে নতুন করে ‘ড্রেসিং টেবিল’ কেলেঙ্কারি: ৩০ হাজারের টেবিল সাড়ে ৫ লাখে ক্রয়! - Uttorpatro TV বালিশের পর এবার ড্রেসিং টেবিল: রূপপুর প্রকল্পে ১৮ গুণ বেশি দামে কেনাকাটার মহোৎসব।

রূপপুর প্রকল্পে নতুন করে ‘ড্রেসিং টেবিল’ কেলেঙ্কারি: ৩০ হাজারের টেবিল সাড়ে ৫ লাখে ক্রয়!

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ৮, ২০২৬
দুর্নীতি প্রতীকী ছবি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে বহুল আলোচিত ‘বালিশ-কাণ্ডের’ রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ড্রেসিং টেবিল ক্রয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। সরকারি প্রকল্পের নথিতে একটি ড্রেসিং টেবিলের দাম দেখানো হয়েছে সাড়ে ৫ লাখ টাকা, যার প্রকৃত বাজারদর মাত্র ৩০ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ বাজারদরের চেয়ে প্রায় ১৮ গুণ বেশি দামে এই আসবাব কেনা হয়েছে।

মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) সাম্প্রতিক এক তদন্ত প্রতিবেদনে এই পুকুরচুরির বিস্তারিত চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রকল্পের আবাসন এলাকা ‘গ্রিন সিটি’র জন্য আসবাবপত্র কেনাকাটায় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সরকারের কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।

তদন্ত নথি অনুযায়ী, গ্রিন সিটির জন্য মোট ১ হাজার ৩৪২টি ড্রেসিং টেবিল সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ২১টি ড্রেসিং টেবিলের প্রত্যেকটির দাম ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া ১৫টি টেবিল ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং ২৯৪টি টেবিল ৫৫ হাজার টাকা দরে কেনা হয়েছে। বাকি টেবিলগুলোর গড় দামও ছিল বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি, যা প্রায় ৪০ হাজার টাকার উপরে।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, একই প্রকল্পে একই মানের পণ্যের ক্ষেত্রে এমন আকাশ-পাতাল দামের পার্থক্য স্পষ্টত দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়। প্রচলিত ক্রয় নীতিমালা লঙ্ঘন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অন্যায্য সুবিধা দিতেই এই কৃত্রিম দাম বাড়ানো হয়েছে।

সিএজির প্রতিবেদনে গাণিতিক হিসাব দিয়ে দেখানো হয়েছে, ১ হাজার ৩৪২টি ড্রেসিং টেবিলের প্রকৃত বাজারমূল্য ছিল ৪ কোটি ৯ লাখ টাকা। কিন্তু প্রকল্প নথিতে এর বিপরীতে বিল তোলা হয়েছে ৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ফলস্বরূপ, শুধুমাত্র এই একটি খাতেই সরকারের ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় বা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, রূপপুর প্রকল্পের ২০টি ভবন নির্মাণ ও সজ্জায় মোট ২৯৫ কোটি টাকা লুটপাটের তথ্য সিএজি রিপোর্টে উঠে এসেছে। সেখানে একটি বালিশের দাম সর্বোচ্চ ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা দেখানোর মতো অবিশ্বাস্য চুরির ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই কেনাকাটা সম্পন্ন হয়। ওই সময়ে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মো. শওকত আকবর। তদন্তে সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে, যারা এই বাড়তি বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতে সরাসরি জড়িত ছিল। অডিট চলাকালীন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের কাছে এই অস্বাভাবিক ব্যয়ের কারণ জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

দুর্নীতির এই ভয়ংকর চিত্র সামনে এলেও এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বড় কোনো আইনি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। চলতি বছরের এপ্রিলে কেবল একজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, যা অপরাধের তুলনায় নগণ্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, রূপপুর প্রকল্পের দুর্নীতি যেহেতু সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হয়েছে, তাই এর সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। জনগনের ট্যাক্সের টাকার এই লুটপাটের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সুশাসনের জন্য অপরিহার্য।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পেশ করা ৩৮টি বিশেষ প্রতিবেদনের মধ্যে এই দুর্নীতির ফাইলটিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে—আগামীতে এই খাতের রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।