পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর অভাবনীয় অবস্থান নিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই সুর মিলিয়ে তিনি দাবি করেছেন, এই নির্বাচনে তিনি হারেননি; বরং চক্রান্ত করে একশোটি আসন লুট করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হার মেনে নিয়ে তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং রাজভবনে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাও তাঁর নেই। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ এলেও তা তিনি মানবেন না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর এমন আচরণে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়েছে। সোমবার রাতে ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোট গণনার সময় পরাজয় নিশ্চিত বুঝে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গণনাকেন্দ্র ত্যাগ করে নিজ বাসভবনে চলে যান। ধারণা করা হয়েছিল, তিনি সাংবিধানিক রীতি মেনে ইস্তফা দেবেন। তবে ট্রাম্প যেভাবে জো বাইডেনের কাছে হারের পর নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন, মমতাকেও একই পথে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অনড় অবস্থান অবশ্য কোনো বড় ধরনের সাংবিধানিক সংকট তৈরি করতে পারবে না। কারণ বর্তমান বিধানসভার মেয়াদ আগামীকাল বৃহস্পতিবার, ৭ মে শেষ হচ্ছে। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর তিনি পদত্যাগ না করলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘সাবেক মুখ্যমন্ত্রী’তে পরিণত হবেন। অন্যদিকে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিজেপি সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতায় এসে নবনির্বাচিত বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠক করে পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচন করবেন। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ৯ মে রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শপথ নিতে পারেন।
মমতার এই রাজনৈতিক কৌশলে ‘দিদি-মোদি সেটিং’ তত্ত্বও এখন প্রশ্নের মুখে। এর আগে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীকে নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখা এবং বিভিন্ন রাজ্যে প্রার্থী দিয়ে বিজেপির সুবিধা করে দেওয়ার অভিযোগে মমতাকে বিরোধী শিবিরে সমালোচিত হতে হয়েছে। তবে এবারের নির্বাচনি বিপর্যয়ের পর রাহুল গান্ধী ফোন করে মমতার ‘ভোট চুরির’ অভিযোগকে সমর্থন জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সর্বভারতীয় রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকতে হলে বিপর্যস্ত মমতার জন্য এখন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ছায়াতলে আসা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
মমতা কি আগামীতে রাজপথের লড়াকু নেত্রী হিসেবে ঘুরে দাঁড়াবেন, নাকি বয়সের ভারে রাজনীতির মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়বেন—তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই মুহূর্তে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিজেপির কড়া নজরদারির মুখে তৃণমূলে পুনর্জাগরণ ঘটানো তাঁর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।