
রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সম্ভাব্য মিছিল, সমাবেশ কিংবা অন্যান্য অপতৎপরতা ঠেকাতে আগাম নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগে থেকেই শনাক্ত করে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সোমবার ডিএমপি সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। সভায় রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি নিষিদ্ধ সংগঠনের সম্ভাব্য তৎপরতা এবং বহিরাগতদের চলাচলের ওপর নজরদারি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
ডিএমপি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর কোনো এলাকায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের মিছিল কিংবা সাংগঠনিক তৎপরতা হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। বিশেষ করে কোনো থানার আওতাধীন এলাকায় এমন কার্যক্রম সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
ডিএমপির নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কোনো অপতৎপরতা সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া। এ জন্য গোয়েন্দা ও অপরাধ বিভাগের বিভিন্ন ইউনিটকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনায় স্পেশালাইজড কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি), গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সন্দেহজনক চলাচল শনাক্ত করতে চেকিং জোরদারের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তায় কোনো ধরনের ফাঁক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির পরিকল্পনায় রাজধানীর প্রবেশপথগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব এলাকায় কঠোরভাবে ব্লক চেক পরিচালনার মাধ্যমে সন্দেহজনক ব্যক্তি ও যানবাহনের চলাচল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে স্পটভিত্তিক নিরাপত্তা জোরদারের কথাও বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় আকস্মিকভাবে লোকজন জড়ো হওয়া কিংবা ঝটিকা মিছিলের মতো ঘটনা ঘটার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলোর অতিথি নিবন্ধন ও তালিকা সংরক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাইরে থেকে আসা ব্যক্তিদের অবস্থান ও চলাচল সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য রাখার মাধ্যমে সম্ভাব্য অপতৎপরতা শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সভায় ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ডিএমপির বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং ছাত্রলীগও সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ। ফলে এসব সংগঠনের নামে কোনো ধরনের কর্মসূচি, মিছিল বা সাংগঠনিক তৎপরতা পরিচালিত হলে তা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিশেষ করে কোনো অপরাধ বিভাগের আওতাধীন এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম বা আকস্মিক মিছিল হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এবং থানার ওসির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
রাজধানীর থানাগুলোতে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের জন্য এই নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ স্থানীয় পর্যায়ে কোনো মিছিল, সমাবেশ বা সংঘবদ্ধ তৎপরতার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে থানা পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে সম্ভাব্য রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কোনো ঘটনা বড় আকার ধারণ করার আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়াই পুলিশের নতুন কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য।
ডিএমপির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় রাজধানীর সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতির পাশাপাশি এসব বিষয় নিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সিটিটিসি, ডিবি এবং থানা পুলিশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
পুলিশের এই কৌশলের ফলে একদিকে যেমন নিষিদ্ধ সংগঠনের সম্ভাব্য কর্মসূচির ওপর নজরদারি বাড়বে, অন্যদিকে রাজধানীতে বহিরাগতদের চলাচল সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে।
ডিএমপির কর্মকর্তারা মনে করছেন, কোনো ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। সেই লক্ষ্যেই এবার রাজধানীতে প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভার মাধ্যমে ডিএমপি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—রাজধানীতে নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো ধরনের তৎপরতা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়।
বিশেষ করে ঝটিকা মিছিল বা আকস্মিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকায় আগে থেকেই নজরদারি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো থানায় নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম সংঘটিত হলে শুধু ঘটনাটি মোকাবিলা করাই নয়, কেন তা আগে থেকে শনাক্ত বা প্রতিরোধ করা গেল না—সেটিও পর্যালোচনা করা হবে।
সব মিলিয়ে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে আগাম গোয়েন্দা তথ্য, সমন্বিত নজরদারি এবং জিরো-গ্যাপ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সামনে রেখে নতুন করে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হচ্ছে ডিএমপি। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সম্ভাব্য তৎপরতা ঠেকাতে এই কৌশল কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়ন ও পুলিশের সমন্বিত তৎপরতার ওপর।