রংপুরে একই পরিবারের চার খুন: হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় পুলিশের নতুন তথ্য - Uttorpatro TV

রংপুরে একই পরিবারের চার খুন: হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় পুলিশের নতুন তথ্য

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 27, 2026

রংপুর নগরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আগের বক্তব্যের চেয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।

সকাল ১০টায় পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে বাসার তৃতীয় তলার খোলা ছাদে হত্যা করা হয়। পরে মা ও মেয়ের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরের সিঁড়ির দিকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। পুলিশের ভাষ্য, পাশের বাড়ির ছাদ কাছাকাছি হওয়ায় সেখান থেকে যেন মরদেহ দেখা না যায়, সে উদ্দেশ্যেই মরদেহ সরিয়ে রাখা হয়।

পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আগে থেকেই ওই বাড়ির ছাদে যাতায়াত করতেন। পুলিশ কমিশনার জানান, তারা সেখানে ইয়াবা সেবন করতেন। ছাদের আশপাশের পরিবেশ এবং দেয়ালের কারণে জায়গাটি বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। ফলে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে দুই তরুণ একসঙ্গে আটটি ইয়াবা সেবন করেন। পরদিন সকালে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গেলে তাদের দেখতে পান। এ সময় তিনি তাদের ধমক দেন। পুলিশের দাবি, আদালতে দেওয়া জবানবন্দি ও তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় দুই তরুণের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তারা গামছা ব্যবহার করে গণপতি চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

এরপর শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাদেরও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পুলিশ বলছে, প্রথমে গামছা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। পরে রশি ব্যবহার করেও গলায় ফাঁস দেওয়া হয়। একপর্যায়ে মা ও মেয়ের মৃত্যু নিশ্চিত করে মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে সরিয়ে রাখা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর নিজেদের উপস্থিতির প্রমাণ গোপন করার চেষ্টা করা হয় বলেও জানিয়েছে পুলিশ। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার বলেন, ছাদে পাওয়া পুরোনো প্লায়ার্স দিয়ে দুই তরুণ নিচতলায় গিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন। তদন্তকারীদের ধারণা, বাড়িতে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা যাতে সচল না থাকে, সে কারণেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।

তবে ঘটনার এখানেই শেষ হয়নি। পুলিশের নতুন বক্তব্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর কক্ষে যাওয়ার পর তাঁর ছেলে আয়ুশ ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থ দাসকে দেখতে পায়। শিশুটি তাকে চেনায় এবং সেখানে কেন এসেছে—এমন প্রশ্ন করে। এ সময় পাশের বাড়ির কেউ শব্দ শুনে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়। পরে শিশুটিকেও কাপড় ব্যবহার করে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এর আগে রোববারের সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ বলেছিল, শিশুটিকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন পুলিশ কমিশনার। তিনি জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই আগের বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। পরে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে শিশুটি ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখেছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়।

হত্যার কারণ নিয়েও তদন্তে নতুন বিষয় সামনে এসেছে। এর আগে পুলিশ জানিয়েছিল, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার জেরেই দুই তরুণ ক্ষুব্ধ হয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটান। তবে বৃহস্পতিবার পুলিশ কমিশনার জানান, এর পাশাপাশি জমিজমা নিয়ে পুরোনো অসন্তোষের বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে।

সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গণপতি চক্রবর্তীদের পরিবারের সঙ্গে সিদ্ধার্থের পূর্বপুরুষের জমি কেনাবেচার সম্পর্ক ছিল। জমির মূল্য পরিশোধ ও পরিবারের শরিকদের প্রাপ্য টাকা নিয়ে কোনো অসন্তোষ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ধরনের কোনো ক্ষোভ হত্যার ঘটনায় ভূমিকা রেখেছিল কি না, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দা দাস বংশের হলেও গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার ছিল ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের। তাদের মধ্যে বাইরে দেখা-সাক্ষাৎ থাকলেও ঘনিষ্ঠ সামাজিক যোগাযোগ বা বাড়িতে যাতায়াতের সম্পর্ক ছিল না বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। এই সামাজিক ব্যবধান কোনো ধরনের ক্ষোভ বা বিরোধের কারণ হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের বক্তব্য নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। লিখিত বক্তব্য দেওয়ার পর পুলিশ কমিশনার মাত্র দুটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন। হত্যার স্থান, সময় এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশের আগের ও বর্তমান বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় আরও প্রশ্নের সুযোগ না পাওয়ায় কয়েকজন সাংবাদিক অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

চার খুনের এই ঘটনায় ইতোমধ্যে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি, ঘটনাস্থলের আলামত, জমিজমা সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক বিষয় যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও পুরো ঘটনাপ্রবাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে পুলিশ। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।