সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদকে ফেরানোর বিষয়ে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। আজ শনিবার সকালে

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদকে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত জোরদারে এগিয়ে চলছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের রেড নোটিশের পর দুবাই পুলিশের হাতে আটক হওয়া সাবেক এই আইজিপির প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ গতিতে কাজ করছে সরকার।
শনিবার সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে আমিরাত পুলিশ বাংলাদেশকে ৩০ দিন সময় দিলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেকর্ড মাত্র তিন দিনের মধ্যে সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও নথি প্রস্তুত করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) থেকে ই-মেইলে অনুরোধ পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত তৎপরতার সাথে কাজ করেছে। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার বিবরণ ও অপরাধের প্রমাণ সম্বলিত ১৪৪ পৃষ্ঠার প্রয়োজনীয় নথিপত্র মাত্র তিন দিনের মধ্যে প্রস্তুত ও যথাযথভাবে অনুবাদ সম্পন্ন করা হয়েছে। এরপর কূটনৈতিক মাধ্যমের সহায়তায় তা ইতিমধ্যে আমিরাত সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
দুবাই থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব এসেছে কি না—জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন,
“ইতিমধ্যে শুক্রবার ও শনিবার পার হয়েছে। আমাদের এখানে এবং আরব আমিরাতেও সাপ্তাহিক ছুটির কারণে অফিশিয়াল কার্যক্রম বন্ধ ছিল। রোববার আমরা কূটনৈতিক স্তরে পুনরায় খোঁজ নেব। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ই-মেইলে তারা এখনও কোনো চূড়ান্ত উত্তর পাঠায়নি। আমিরাতের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া মেনে যথাসময়েই তারা উত্তর দেবে।”
বেনজীর আহমেদকে ফেরত আনা নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা বা দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকার শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “চুক্তি থাকা বা না থাকার প্রশ্নটি এখানে অবান্তর। আমরা এবং আরব আমিরাত উভয় দেশই জাতিসংঘ সনদের (UN Charter) বিভিন্ন ধারায় স্বাক্ষরকারী দেশ। আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের এই সনদ অনুসারেই এর আগেও দুই দেশের মধ্যে অপরাধী বিনিময় হয়েছে। ফলে বেনজীর আহমেদকে ফেরত আনার প্রক্রিয়া জটিল হবে বলে আমি মনে করি না।”
ব্রিফিংয়ে রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আগামী ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পুলিশ সদর দপ্তরের বিশেষ সতর্কতা জারির বিষয়ে তিনি স্পষ্ট বক্তব্য দেন।
মন্ত্রী বলেন, “সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক রাখা আমাদের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ। যেহেতু আমরা আশঙ্কা করছি যে ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে নিষিদ্ধ হওয়া একটি রাজনৈতিক দল দেশে নতুন করে অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। রাজনৈতিকভাবে আমরা মনে করি এটি কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি একটি মাফিয়া গোষ্ঠী। তারা যাতে কোনো ধরনের অরাজকতা করতে না পারে, সেজন্য পুলিশ বাহিনীকে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকাটি বিগত বহু বছর ধরে অপরাধীদের একটি চারণভূমি বা অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। এই বিশেষ জোনটিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার বিশেষ কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সেখানে পর্যায়ক্রমে চিরুনি অভিযান চালিয়ে সব ধরনের অপরাধী ও গ্যাং মেম্বারদের নির্মূল করা হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাদের পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও সাহসিকতা ফিরে পেয়েছে। দেশের নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় কাজ করছে। বর্তমানে যেকোনো অপরাধের তথ্য পাওয়ার সাথে সাথে মামলা হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে আসা অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গত সাড়ে তিন মাসে পুলিশের এই ইতিবাচক পরিবর্তন সত্যিই প্রশংসনীয়।
বিভাগীয় শৃঙ্খলা প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, গাজীপুরের সাবেক পুলিশ কমিশনার নাজমুল করিম খানের সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি আইনি বিধিমালা অনুযায়ী প্রক্রিয়াধীন। অপরদিকে, চট্টগ্রামে জাতীয় ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে হেনস্তা ও নির্যাতনের ঘটনায় তদন্ত শেষ করে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট কনস্টেবল, সাব-ইন্সপেক্টর ও ওসির বিরুদ্ধে বরখাস্ত ও প্রত্যাহারের মতো কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপরাধী পুলিশ হলেও কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে মন্ত্রী কর্তব্যনিষ্ঠা ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ পুলিশের ১৫ জন সদস্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার, সনদ ও আর্থিক সম্মানী প্রদান করেন।