স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে ছবি: প্রথম আলো

দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের বীর যোদ্ধাদের মতো গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটেই এই ভাতার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হবে। আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘প্রতিকার ও পুনর্বাসনের অধিকার’ শীর্ষক এক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে এই বিশেষ সংলাপে যৌথভাবে আয়োজন করে হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি) ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সংগঠন ‘মায়ের ডাক’।
সংলাপে সমবায়মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “আমি বারবার একটি কথা বলেছি, যদি দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত রাষ্ট্রীয় ভাতা দেওয়া হয়, যদি জুলাই বিপ্লবের অকুতোভয় যোদ্ধাদের ভাতার ব্যবস্থা করা হয়, তবে বছরের পর বছর গুমের শিকার হওয়া পরিবারগুলোকে কেন এই সহায়তার বাইরে রাখা হবে? রাষ্ট্র অবশ্যই তাদের পাশে দাঁড়াবে। আমরা আগামী বাজেটেই এই পরিবারগুলোর আর্থিক সুরক্ষায় বিশেষ প্রভিশন বা বরাদ্দের ব্যবস্থা নিশ্চিত করব।”
মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন যে, প্রিয়জনকে হারানোর যে মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি, তা কখনো কোনো অর্থ বা ভাতা দিয়ে পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহস দিতে পারে এবং তাদের ভবিষ্যৎ নতুন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে পারে। গুমের ঘটনাকে চরম ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, যারা এই জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত ছিল, তাদের প্রত্যেকের প্রকাশ্যে বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।
সাবেক সরকারের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের দাম্ভিকতার কথা স্মরণ করে মির্জা ফখরুল বলেন, “সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যক্তি বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান আজ ধরা পড়েছে এবং তার বিচার চলছে। অন্যদিকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। একসময় তাদের যে অহংকার ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল, তা আজ চূর্ণ হয়েছে। সৃষ্টিকর্তা ঠিকই তাদের আদালতের কাঠগড়ায় এবং জনগণের সামনে হাজির করেছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাকি অপরাধীরাও একে একে ধরা পড়বে এবং কেউ রেহাই পাবে না।”
তিনি এই মানবিক সংকটকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর আইনি ও সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা এবং আইনের মূল শক্তি ভুক্তভোগীদের হাতে তুলে দেওয়াই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।
জাতীয় এই সংলাপে ২০১৩ সালে গুম হওয়া গাড়িচালক কাওসার হোসেনের মেয়ে লামিয়া আক্তার মীম তার এক যুগেরও বেশি সময়ের বেদনাকাতর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারানো মীম অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আমি বাবাকে দেখিনি। আমার কাছে বাবার সাথে কোনো স্মৃতি নেই, শুধু একটা ছবি ছাড়া। ২০২৫ সালের জুনে আমি যখন ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনে যাই, সেখানকার একেকটি ‘কবর সেল’ দেখে শিউরে উঠেছি। একটা সুস্থ মানুষ সেখানে পাঁচ মিনিট থাকলে পাগল হয়ে যাবে। সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আমার বাবা ও চাচারা বছরের পর বছর থেকেছেন।”
মীম আরও বলেন, “আমি তো সরকারের কাছে কোটি টাকা চাইনি। আমি শুধু আমার বাবার সন্ধান আর এই অন্যায়ের বিচার চেয়েছিলাম। বাবা যদি মারাও যেতেন, অন্তত একটা কবর থাকত, যেখানে দাঁড়িয়ে একটু শান্তি পেতাম।”
সংলাপে বক্তব্য দেন ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং বিগত ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে দীর্ঘদিন গুমের শিকার থাকা মীর আহমাদ বিন কাসেম। তিনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন:
১. গুমের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ভুক্তভোগীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
২. ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন ও এককালীন বা মাসিক অর্থনৈতিক সহায়তা।
৩. ভবিষ্যতে যেন কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য কঠোর আইন প্রণয়ন।
তিনি আরও প্রস্তাব করেন যে, তরুণ প্রজন্মকে ফ্যাসিবাদের অন্ধকার দিক চেনাতে ‘জুলাই জাদুঘর’-কে একটি জাতীয় পাঠশালা হিসেবে লালন করা উচিত।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন সংলাপে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে বলেন, অতীতে বুড়িগঙ্গা বা বিভিন্ন নদী থেকে উদ্ধার হওয়া পরিচয়হীন লাশগুলোর সংরক্ষিত ডিএনএ নমুনার সাথে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের ডিএনএ প্রোফাইল মিলিয়ে দেখা জরুরি। এর মাধ্যমে অনেক পরিবার তাদের প্রিয়জনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবে।
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলির স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংলাপে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামসহ দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।