রাজধানী ঢাকা (কাশিয়ানী প্রতিনিধি): গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় এক অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং এক তরুণকে দেবদারুগাছের সঙ্গে বেঁধে প্রকাশ্যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর মতো এক চরম বর্বর ঘটনার চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় শত শত মানুষের উপস্থিতিতে গামছা দিয়ে বেঁধে এই নিপীড়ন চালানো হয়। পরবর্তীতে সেই নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে চরম লোকলজ্জা, অপমান ও মানসিক যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে ওই স্কুলছাত্রী নিজ বাড়িতে বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৮ জুলাই দুপুরে উপজেলার একটি স্থানীয় উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ঘটনার বেশ কয়েকটি স্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং পুরো এলাকা জুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ জুলাই ওই ছাত্রী ও এক তরুণকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পাওয়ার অভিযোগ এনে পরদিন ২৮ জুলাই দুপুরে তরুণকে তাঁর বাড়ি থেকে এবং ছাত্রীকে বিদ্যালয়ের বাইরে থেকে ডেকে এনে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হাজির করা হয়। এরপর এলাকার কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক কোনো রকম বিচার-বিবেচনা ছাড়াই ওই ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ও তরুণকে বিদ্যালয়ের ভেতরের একটি দেবদারুগাছের সঙ্গে গামছা দিয়ে নির্মমভাবে বেঁধে ফেলে। উপস্থিত লোকজনের সামনেই তাঁদের ওপর চলে মানসিক নিপীড়ন ও শারীরিকভাবে প্রহার।
উপস্থিত উৎসুক জনতার অনেকেই সেই দৃশ্য নিজ নিজ মোবাইল ফোনে ধারণ করেন এবং ঘটনার তিন দিন পর শুক্রবার রাতে তা সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন। নির্যাতনের ভিডিও মুহূর্তে ভাইরাল হওয়ার পর চরম অপমানে ভেঙে পড়ে অষ্টম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী। মানসিক যন্ত্রণায় সে নিজ বাড়িতে বিষপান করলে পরিবার ও প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে দ্রুত গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে ওই শিক্ষার্থী সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছে।
স্কুল প্রাঙ্গণে সরাসরি এমন নৃশংস ও বেআইনি কর্মকাণ্ড চললেও দীর্ঘ তিন দিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের নীরব ভূমিকা নিয়ে শিক্ষক ও স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ কিংবা শিক্ষকদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আইনি ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
এদিকে এ ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে স্থানীয় নয়ন বাড়ৈ, জয় শিকদার ও মিশন রায়সহ আরও কয়েকজন যুবকের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ অস্বীকার করে নয়ন বাড়ৈ দাবি করেন, এলাকার যুবকরা তাঁদের নিয়ে আসার পর তিনি কেবল অভিভাবকদের খবর দেওয়ার জন্য স্কুলে নিয়ে যান, কিন্তু গাছে বেঁধে নির্যাতনের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, ঘটনার দিন তিনি এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না; তবে ক্যাম্পাসে ফিরে সভাপতিসহ আলোচনা করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
থানা পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি সম্পর্কে তারা অবগত হয়েছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের না করা হলেও অভিযোগ পাওয়া মাত্রই দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।