অনলাইন ডেস্ক: দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর প্রকাশিত এক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বিগত তিন মাসে দেশের রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও সংঘাতের ঘটনায় অন্তত ৪১ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৯৭০ জন। এই সহিংসতার বড় একটি অংশই ঘটেছে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে কেবল রাজনৈতিক কোন্দলই নয়, বরং সীমান্তে বিএসএফের আক্রমণ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত, গণপিটুনি এবং নারী ও শিশুদের ওপর নির্মম নির্যাতনের তথ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলোচ্য তিন মাসের মধ্যে এপ্রিলে ১৫ জন, মে মাসে ১০ জন এবং জুন মাসে ১৬ জন রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন। রাজনৈতিক আধিপত্য রক্ষা, স্থানীয় প্রভাব বিস্তার এবং চাঁদাবাজির মতো ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে এসব সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়, যা পরবর্তীতে মারাত্মক সংঘাতের রূপ নেয়।
সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। অধিকার-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ সময় বিএসএফের গুলি ও শারীরিক নির্যাতনে অন্তত সাতজন বাংলাদেশি নিহত হন এবং আহত হন আরও তিনজন। নিহতদের মধ্যে ছয়জনকে সরাসরি গুলি করে এবং একজনকে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া মে মাসে সীমান্ত দিয়ে ১০ জন মানুষকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) ঘটনা ঘটে।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সারা দেশে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের হার বেড়েছে। এই তিন মাসে অন্তত ১৭ জন সাংবাদিক সরাসরি হামলার শিকার হয়ে আহত হয়েছেন। এছাড়া পাঁচজন লাঞ্ছিত, চারজন আক্রান্ত এবং সাতজন সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছেন। একই সময়ে সাতজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইনি মামলা দায়েরের ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় প্রভাবশালী দুষ্কৃতকারীদের এসব হামলায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সামাজিক অপরাধ ও সহিংসতার মধ্যে সবচেয়ে আতঙ্কজনক চিত্র দেখা গেছে নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রে। তিন মাসে মোট ২৫৫ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ১৬১ জনই ছিল শিশু (১৮ বছরের নিচে)। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬১ জন। নির্যাতনের ভয়াবহতায় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ১৪ জনকে (১১ জন শিশু ও ৩ জন নারী) এবং এক শিশু আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
যৌতুকের দাবির কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৩ জন নারী, যার মধ্যে ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩ জন বাধ্য হয়ে আত্মহত্যা করেছেন। পাশাপাশি ১৭ জন নারী ও শিশু যৌন হয়রানির শিকার হন, যা প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন দুইজন পুরুষ।
দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার কারণে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে সারা দেশে অন্তত ৩৩ জন মানুষ গণপিটুনিতে নিহত হন। অন্যদিকে, বিভিন্ন কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় সঠিক চিকিৎসাসেবার অভাবে বা অসুস্থতাজনিত কারণে অন্তত ১৬ জন বন্দির মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের এই সার্বিক মানবাধিকার সংকট কাটাতে এবং দেশে আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ প্রদান করেছে ‘অধিকার’। সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
বিচারের স্বচ্ছতা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করা।
জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতে নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।
আইন প্রণয়ন: গুম ও নির্যাতন প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর আইন প্রণয়ন করা।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিধান এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক বা হয়রানিমূলক মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা।
শ্রমিক ও সীমান্ত সুরক্ষা: তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বকেয়া বেতন মেটানো, প্রবাসী ও অভিবাসী নারীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক হত্যাকাণ্ড ও অবৈধ পুশইন বন্ধে ভারত সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।
দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করতে অবিলম্বে মানবাধিকারভিত্তিক প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে তাগিদ দেওয়া হয়।