অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক বছরে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেন ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, শীর্ষে পাসপোর্ট ও বিআরটিএ: টিআইবি - Uttorpatro TV সেবা খাতে ১ বছরে ঘুষ ১২,৬৩৩ কোটি টাকা: টিআইবি জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক বছরে সেবা খাতে ঘুষ লেনদেন ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, শীর্ষে পাসপোর্ট ও বিআরটিএ: টিআইবি

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 25, 2026
‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক এক জরিপের ফলাফলের তথ্য তুলে ধরেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে ছবি: প্রথম আলো

দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবা খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায়। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে। এই জরিপটি মূলত দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের প্রশাসনিক ও সেবা খাতের দুর্নীতির একটি বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনের ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে এই তথ্য জানানো হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বৈজ্ঞানিক নমুনাকাঠামো অনুসরণ করে দেশের আটটি বিভাগের গ্রামীণ ও নগর অঞ্চল থেকে দুই ধাপে সম্পূর্ণ দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ১ হাজার ১৪৯টি এলাকা নির্বাচন করে এই মাঠপর্যায়ের জরিপটি পরিচালনা করেছে টিআইবি। যেখানে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িত সুনির্দিষ্ট ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতের সার্বিক চিত্র বিশদভাবে মূল্যায়িত হয়েছে।

টিআইবি-এর ২০২৫ সালের জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত ২০২৩ সালের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবারও পাসপোর্ট এবং বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) খাত দুটিতে দুর্নীতির প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে সর্বোচ্চ ৭৬.৬ শতাংশ এবং বিআরটিএ-তে ৬৩.৫ শতাংশ সেবাগ্রহীতা কোনো না কোনোভাবে ঘুষ বা দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছেন। এই দুটি শীর্ষ খাতের পর সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি প্রশাসন ও বিচারিক সেবার মতো অতি প্রয়োজনীয় খাতগুলোতে। শুধু তাই নয়, এই খাতগুলোতেই পরিবারপ্রতি ঘুষ প্রদানের গড় আর্থিক পরিমাণও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

তবে একটি ইতিবাচক দিক হলো, সার্বিক বিবেচনায় পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় এবার প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গত এক বছরে খানা বা পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১২৪ টাকা।

জরিপে অংশ নেওয়া সিংহভাগ অর্থাৎ ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঘুষ বা অতিরিক্ত অর্থ প্রদান ছাড়া স্বাভাবিক উপায়ে সেবা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের মতো স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে দুর্নীতির এই উচ্চ হার সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতেও দুর্নীতির পুরনো ধারা একই রকম রয়ে গেছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুর্নীতির শিকার হওয়ার পরও প্রায় ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেনি। অধিকাংশ নাগরিকের মতে, দেশের পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি মিশে থাকায় অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই। আবার প্রায় অর্ধেক পরিবারেরই জানা নেই যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোথায় বা কীভাবে অভিযোগ করতে হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্পর্কে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ অবগত থাকলেও, সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা বা জিআরএস (GRS) সম্পর্কে জানেন মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ। আর যারা কষ্ট করে অভিযোগ করেছেন, তাদের সিংহভাগের অভিযোগই আলোর মুখ দেখেনি কিংবা কোনো প্রতিকার মেলেনি। উত্তরদাতাদের মতে, এই লাগামহীন দুর্নীতির প্রধান কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সচেতনতার অভাব এবং অপরাধীদের শাস্তির মুখোমুখি না হওয়া।

প্রতিবেদনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ বেশি দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গ্রামের ৬৬ শতাংশ পরিবার ঘুষের শিকার হয়েছে, যেখানে শহরের ক্ষেত্রে এই হার ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে মোট টাকার অংকের দিক থেকে বিচার করলে শহরের বাসিন্দাদের গ্রামের চেয়ে বেশি পরিমাণ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, দেশের নিম্ন আয়ের দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের আয়ের অনুপাতের চেয়ে অনেক বেশি হারে ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়া নারী, আদিবাসী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়াটি দিন দিন আরও জটিল ও বৈষম্যমূলক হয়ে উঠছে।

টিআইবি আরও উল্লেখ করেছে যে, গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সরকারি সেবা ডিজিটাল বা অনলাইন মাধ্যমে রূপান্তর করা হলেও তা দুর্নীতি প্রতিরোধে পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। কারণ এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের দালাল চক্র বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে ঘুষের নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করছে।