বাজেট ঘিরে উসকানি ও বিভ্রান্তি রুখতে সতর্ক করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান - Uttorpatro TV

বাজেট ঘিরে উসকানি ও বিভ্রান্তি রুখতে সতর্ক করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: জুন ৬, ২০২৬

জাতীয় সংসদের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন শুরুর ঠিক আগের দিন এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেছিল সরকারদলীয় সংসদীয় দল। শনিবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এই দীর্ঘ সভায় দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আসন্ন বাজেট এবং দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর ও দিকনির্দেশনামূলক বার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টা স্থায়ী এই উচ্চপর্যায়ের সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।

দেশজুড়ে কঠোর অভিযানের ঘোষণা

সভায় দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখতে খুব শিগগিরই সারা দেশে একটি সমন্বিত ও বিশেষ অভিযান শুরু করা হবে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের দলের জনপ্রতিনিধিদেরও কড়া হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, দলের ভেতরে কোনো ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্ব, কোন্দল বা অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সভায় অকপটে স্বীকার করেন যে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী তাঁকে অন্তত দুই বার তাগিদ দিয়েছেন এবং দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

বাজেট ও সম্ভাব্য উসকানি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা

রবিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রসঙ্গে সংসদ সদস্যদের আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী অর্থনৈতিক চাপ এবং বিশাল ঘাটতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকারের যাত্রা শুরু হচ্ছে। তবে অর্থমন্ত্রী ও তিনি নিজে দীর্ঘ সময় ধরে এই বাজেট তৈরিতে কাজ করেছেন। ফলে একটি সুন্দর ও জনবান্ধব বাজেট দেশবাসী পেতে যাচ্ছে, যা সবাইকে সন্তুষ্ট করবে।

তবে বাজেট ঘোষণার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি দলীয় সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, বাজেটকে কেন্দ্র করে বিরোধী দল ও বিভিন্ন মহল থেকে উসকানিমূলক বক্তব্য আসতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই উত্তেজিত না হয়ে অত্যন্ত ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সঙ্গে মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য তিনি নির্দেশ দেন।

সংসদীয় কাজে দক্ষতা ও নারী এমপিদের দায়িত্ব বণ্টন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ সদস্যদের কেবল নির্বাচনী এলাকার কাজেই নয়, বরং সংসদীয় কার্যক্রমেও নিজেদের দক্ষ করে তোলার পরামর্শ দেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভায় কোনো রদবদল বা সম্প্রসারণ করা হলে, সংসদীয় কার্যক্রমে পারদর্শী সংসদ সদস্যদেরই সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বৈঠকে সংরক্ষিত আসনের ৩৬ জন নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়। বিশেষ করে যেসব আসনে বিরোধী দলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন, সেসব এলাকায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে এবং দলীয় ভিত্তি মজবুত করতে নারী সংসদ সদস্যদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বন্দর ইজারা নিয়ে আলোচনা

সংসদীয় দলের এই প্রাণবন্ত সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যরা স্ব স্ব মন্ত্রীদের নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেন। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশী অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করেন এক সংসদ সদস্য। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মৃতির স্মারক এই টার্মিনালটি দেশীয় ব্যবস্থাপনায় রাখার দাবি জানান তিনি।

শিক্ষা খাতের আলোচনায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় আশঙ্কাজনক হারে শিক্ষার্থী কমে যাওয়া এবং মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারের বিষয়টি উঠে আসে। পাশাপাশি প্রতিটি স্কুলে হিন্দুধর্মসহ অন্য ধর্মের শিক্ষকদের সংকট দূর করার তাগিদ দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য খাতের আলোচনায় সংসদ সদস্যরা উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালগুলোর শয্যা বাড়ানোর আগে বর্তমান জনবলসংকট দূর করার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে ঢাকার পুরোনো পিজি হাসপাতালের মতো বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে সেবার মান বাড়াতে বেসরকারি বিনিয়োগ বা অংশীদারত্বের (পিপিপি) বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে বলে সভায় জানানো হয়।

সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সরকারের শীর্ষ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীবর্গ উপস্থিত থেকে নিজ নিজ দপ্তরের কর্মপরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাজেট অধিবেশনের আগে এই বৈঠক সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বাড়াতে এবং মাঠপর্যায়ের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে।