গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এই বাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র জল্পনা-কল্পনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত সংস্কারের মাধ্যমে একে একটি আধুনিক ও পেশাদার এলিট ফোর্স হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সোমবার র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে সরকারের এই অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, সম্পূর্ণভাবে মানবাধিকারকে সমুন্নত রেখে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করে আগামী দিনে একটি আধুনিক ও পেশাদার এলিট ফোর্স গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। তবে এই বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামো, পোশাক বা পোস্টিংয়ে কী কী ধরনের সুনির্দিষ্ট সংস্কার আনা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই বাহিনীর অপারেশনাল কার্যক্রম অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। নতুন করে যেন কোনো বিতর্ক বা প্রশ্নের সৃষ্টি না হয়, সে জন্য এখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শুধু নিয়মিত অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে বাহিনীর কার্যক্রম।
আওয়ামী লীগ আমলের পতনের পর র্যাবের অতীতের নৃশংস কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের দেওয়া এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ঘটে যাওয়া মোট গুমের ঘটনার প্রায় ২৫ শতাংশের সঙ্গেই একক বাহিনী হিসেবে র্যাব জড়িত ছিল, যা সব বাহিনীর মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া সারা দেশে আবিষ্কৃত ৪০টি গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘরের’ মধ্যে ২২ থেকে ২৩টিই ছিল র্যাবের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে, পুলিশের বিশেষ শাখার নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ১ হাজার ৭টি ক্রসফায়ারের ঘটনায় ১ হাজার ২৯৩ জন নিহত হন, যার মধ্যে ২৯৩টি ঘটনায় সরাসরি র্যাবের নাম এসেছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপর ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান নারায়ণগঞ্জের সাত খুনসহ র্যাবের দ্বারা অতীতে নির্যাতিত ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া পরিবারগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একই সঙ্গে তিনি সংস্থায় গোপন বন্দিশালা থাকার বিষয়টিও স্বীকার করে নেন। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘসহ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন র্যাবকে পুরোপুরি বিলুপ্ত করার জোর সুপারিশ করে। এমনকি বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা দল বিএনপিও ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলন করে এই বাহিনীকে ‘দানব’ আখ্যা দিয়ে এর সম্পূর্ণ বিলুপ্তি চেয়েছিল। তবে বর্তমানে সরকার গঠনের পর দলটি সেই অবস্থান থেকে সরে এসে সংস্কারের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান মনে করেন, র্যাবের বর্তমান কাঠামো পুরোপুরি বদলানো জরুরি। তার মতে, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে যুক্ত রাখা ঠিক নয়। বরং পুলিশ বাহিনীর মধ্য থেকেই দক্ষ সদস্যদের নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এমন ইউনিট গঠন করা যেতে পারে।
একই সুর শোনা গেছে সাবেক গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “র্যাব নামটি ইতিমধ্যে দেশে ও বিদেশে একটি আতঙ্ক এবং বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। তাই জনগণের আস্থা ফেরাতে এই বাহিনীর নাম পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।” এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় র্যাবের নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেক্টাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ বা এসআইএফ করার একটি প্রস্তাব অনুমোদিত হলেও পরবর্তীতে তা আর আলো দেখেনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, র্যাব নিয়ে সরকারের এই দ্বিমুখী অবস্থান বা সিদ্ধান্তহীনতা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাই এই বাহিনীকে বহাল রাখতে হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এর আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করে এর সংস্কারের দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে।