ইতিহাস গড়লেন এমবাপ্পে, স্পেনের জয়জয়কারের বিশ্বকাপে খালি হাতে ফিরলেন মেসি - Uttorpatro TV বিশ্বকাপ ২০২৬: এমবাপ্পের গোল্ডেন বুটের রেকর্ড ও চ্যাম্পিয়ন স্পেনের রাজত্ব

ইতিহাস গড়লেন এমবাপ্পে, স্পেনের জয়জয়কারের বিশ্বকাপে খালি হাতে ফিরলেন মেসি

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: July 20, 2026
গোল্ডেন বলে চুমু খাচ্ছেন রদ্রি-রয়টার্স

ক্রীড়া প্রতিবেদক: ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর ফাইনালের কথা ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকার কথা। লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের সেই অতিমানবীয় দ্বৈরথ শেষ হয়েছিল টাইব্রেকারের নাটকীয়তায়। সেবার ট্রফি ও গোল্ডেন বল উঠেছিল মেসির হাতে, আর এমবাপ্পে সান্ত্বনা খুঁজেছিলেন গোল্ডেন বুটে। তবে ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা) বিশ্বকাপে চিত্রনাট্য বদলে গেল সম্পূর্ণ নতুন এক আবহে। এবারও দুই মহাতারকার ব্যক্তিগত দ্বৈরথ জমে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ হাসিতে নতুন এক ইতিহাস লিখে নিলেন ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। আর ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিদায়বেলায় লিওনেল মেসিকে ফিরতে হলো খালি হাতে, রানার্সআপের সিলভার বুট নিয়ে।

এমবাপ্পের ইতিহাস ও গোলের মহাকাব্য

চলতি বিশ্বকাপে ফুটবলবিশ্ব দেখেছে কিলিয়ান এমবাপ্পের রুদ্ররূপ। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা দুবার গোল্ডেন বুট জেতার অনন্য কীর্তি গড়লেন এই ফরাসি স্ট্রাইকার। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে দল ৬-৪ গোলে হারলেও, এমবাপ্পের পা থেকে আসে দুর্দান্ত জোড়া গোল। আর তাতেই তাঁর গোল্ডেন বুট জয় অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়।

পুরো টুর্নামেন্টে ১০টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন কাতারে করা নিজের ৮ গোলের রেকর্ডকে। বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন মোট ২২ গোল নিয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই এমবাপ্পে যেভাবে রেকর্ডের পর রেকর্ড ভেঙে চলেছেন, তাতে তাঁর ভবিষ্যৎ সীমারেখা কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়ে এখনই চলছে জল্পনা-কল্পনা।

শুধু তা-ই নয়, ১৯৭০ সালে জার্মান কিংবদন্তি গার্ড মুলারের পর এমবাপ্পেই প্রথম খেলোয়াড়, যিনি বিশ্বকাপের এক আসরে ১০টি গোল করার মাইলফলক ছুঁলেন। দীর্ঘ ৫৬ বছর পর এই কীর্তি দেখল ফুটবল বিশ্ব। তবে এক বিশ্বকাপে ১৯৫৮ সালে ফ্রান্সেরই জুস্ত ফন্তেইনের করা ১৩ গোলের রেকর্ডটি এখনও অক্ষত রয়েছে।

মেসির শূন্য হাতে বিদায় ও সিলভার বুট

অন্যদিকে, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করা আর্জেন্টিনা এবারও ফাইনালে উঠেছিল শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়ে। মেসির সামনে সুযোগ ছিল গোলসংখ্যায় এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। তবে অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের রক্ষণভাগের ইস্পাতকঠিন দেয়ালে আটকে যায় আর্জেন্টিনার সব আক্রমণ। ফাইনালে মেসির পা থেকে কোনো গোল না আসায় ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাঁকে। ফলে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে হেরে সিলভার বুট বগলদাবা করেন এলএমটেন। এর মাধ্যমে ২১ গোল নিয়ে শেষ হলো মেসির বর্ণিল বিশ্বকাপ অধ্যায়।

বেলিংহামের ব্রোঞ্জ বুট

গোল্ডেন ও সিলভার বুটের পর ব্রোঞ্জ বুটের লড়াইটিও ছিল বেশ জমজমাট। ৭ গোল এবং ১ অ্যাসিস্ট নিয়ে ব্রোঞ্জ বুট নিজের করে নেন ইংল্যান্ডের মাঝমাঠের চালিকাশক্তি জুড বেলিংহাম। নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হলান্ডও সমান ৭টি গোল করেছিলেন, তবে অ্যাসিস্টের সমীকরণে পিছিয়ে থাকায় বেলিংহামের পেছনে পড়তে হয় তাঁকে।

স্পেনের রাজত্ব ও রদ্রি-উনাই সিমনদের প্রাচীর

এবারকার বিশ্বকাপের আসল রূপকার ছিল ইউরোপিয়ান পরাশক্তি স্পেন। ফাইনাল ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবার বিশ্বসেরার মুকুট মাথায় তুলল তারা। স্পেনের এই শিরোপা জয়ের পেছনে গোলবন্যার চেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল নিখুঁত ট্যাকটিকস ও অতিমানবীয় ডিফেন্সের।

পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের জয়ের সুতো যিনি বুনেছেন, তিনি হলেন ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ী মাঝমাঠের জাদুকর রদ্রি। চোখধাঁধানো ড্রিবলিং বা অতিরিক্ত গোল না থাকলেও, সেমিফাইনালে ফ্রান্স এবং ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ জিতে নেন তিনি।

একই সাথে স্পেনের রক্ষণভাগ এবার নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ১টি গোল হজম করে এবং ৭টি ক্লিন শিট রেখে গোল্ডেন গ্লাভস জিতেছেন স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন। এই যাত্রায় টানা ৬৪৯ মিনিট নিজের জাল অক্ষত রেখে বিশ্বকাপের নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েন অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের এই গোলকিপার।

তরুণদের মাঝে আলো ছড়িয়েছেন বার্সেলোনার ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার পাউ কুবারসি। স্পেনের রক্ষণভাগকে দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করার পুরস্কার হিসেবে তাঁর হাতে উঠেছে সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের ট্রফি।

ফিফার নতুন রীতি ও রেকর্ড প্রাইজমানি

৪৮ দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপে ফিফা যুক্ত করেছে নতুন এক রীতি। চ্যাম্পিয়ন দল স্পেনের ফুটবলারদের হাতে এবার ট্রফির পাশাপাশি তুলে দেওয়া হয়েছে বিশেষ ‘চ্যাম্পিয়নশিপ রিং’। এর সাথে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্পেন দল পেয়েছে ৫ কোটি মার্কিন ডলার প্রাইজমানি, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আর্থিক পুরস্কারের রেকর্ড।