ইসরাইলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনি নারী দানা জুদেহ।

অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গ্রেপ্তারের প্রায় ছয় মাস পর ইসরাইলের দেমন কারাগারে কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নারী দানা জুদেহ। সোমবার উত্তর অধিকৃত ফিলিস্তিনের ওই কারাগারে তিনি সন্তান প্রসব করেন বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে। ঘটনাটি সামনে আসার পর তাঁর ও নবজাতকের নিরাপত্তা এবং কারাগারে গর্ভবতী বন্দিদের চিকিৎসাসেবা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দানা জুদেহ নাবলুস গভর্নরেটের ইরাক আল-তাইয়েহ এলাকার বাসিন্দা। প্রায় ছয় মাস আগে তাঁকে প্রশাসনিক আটকাদেশের আওতায় গ্রেপ্তার করা হয়। এই ব্যবস্থায় কোনো অভিযোগ বা বিচারিক কার্যক্রম ছাড়াই একজন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটক রাখা সম্ভব। জুদেহও এ ধরনের আটকাদেশের আওতায় এতদিন কারাগারে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তাঁর বর্তমান আটকাদেশের মেয়াদ মঙ্গলবার শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তা আবার বাড়ানো হলে তাঁর মুক্তি আরও অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবার ও অধিকারকর্মীরা।
জুদেহর পরিবার এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা এবং পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না দেওয়ার কারণে মা ও নবজাতক দুজনের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাঁদের দাবি, একজন গর্ভবতী বন্দির জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পুষ্টি ও প্রসব-পূর্ব এবং প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কারাগারে সন্তান প্রসবের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পরও গর্ভবতী বন্দির স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এ ঘটনায় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ও কারা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
অধিকারকর্মীরা বলছেন, গর্ভবতী নারী বন্দিদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পুষ্টিকর খাবার এবং নিরাপদ প্রসবের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা মানবিক ও স্বাস্থ্যগত—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেমন কারাগারে প্রায় ৮৮ জন ফিলিস্তিনি নারী বন্দি রয়েছেন। তাঁদের অবস্থার বিষয়ে বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনি অধিকার সংগঠনগুলো। বন্দিদের মধ্যে চিকিৎসাসেবায় ঘাটতি, পর্যাপ্ত খাবারের সংকট এবং বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বন্দিদের ওপর চাপ সৃষ্টি, একাকী বন্দিত্ব, মৌলিক অধিকার সীমিত করা এবং ধর্মীয় অনুশীলনে বাধা দেওয়ার মতো অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
দানা জুদেহর ঘটনা তাই শুধু একজন বন্দির সন্তান প্রসবের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং আটক নারী ও গর্ভবতী বন্দিদের অধিকার এবং কারাগারে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রশ্ন হিসেবেও সামনে এসেছে।
ফিলিস্তিনি বন্দি ও সাবেক বন্দিদের বিষয়ক কমিশন নারী বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের ওপর রয়েছে বলে জানিয়েছে। সংস্থাটি বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, অসুস্থ ব্যক্তি, অপ্রাপ্তবয়স্ক, বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধী বন্দিদের বিষয়ে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক সংগঠনগুলোকেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের মতে, কারাগারে আটক ব্যক্তিদের মৌলিক অধিকার এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রশাসনিক আটক ব্যবস্থা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনা রয়েছে। তাদের বক্তব্য, অভিযোগ বা বিচারিক রায়ের বাইরে দীর্ঘ সময় কাউকে আটক রাখা হলে তা বন্দির আইনগত অধিকার ও ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। জুদেহর ক্ষেত্রে আটকাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা নবায়ন করা হলে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
এদিকে একটি কারাগারে নবজাতকের জন্ম দেওয়ার ঘটনাটি মা ও শিশুর জন্য পরবর্তী পরিচর্যার বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। প্রসবের পর মায়ের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন অধিকারকর্মীরা।
ফিলিস্তিনি পক্ষের অভিযোগ ও আহ্বানের পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনায় স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বন্দিদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও আইনগত অবস্থার বিষয়ে সঠিক তথ্য ছাড়া পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন।
দানা জুদেহর ক্ষেত্রে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—তাঁর আটকাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে, নাকি তা আবারও বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটির দেখভাল এবং মা ও শিশুর চিকিৎসা ও নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আহ্বান, গর্ভবতী ও বিশেষ ঝুঁকিতে থাকা বন্দিদের ক্ষেত্রে মানবিক ও চিকিৎসাগত প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেমন কারাগারে দানা জুদেহর সন্তান প্রসবের ঘটনা সেই দাবিকে আরও জোরালো করেছে।
সূত্র: মিডলইস্ট মনিটর