ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদ ও পরিবারের দুই সদস্যের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা - Uttorpatro TV

ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদ ও পরিবারের দুই সদস্যের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: September 15, 2026

ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ এবং তাঁর পরিবারের দুই সদস্যের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

মামলার অপর দুই আসামি হলেন শেখ মামুন খালেদের স্ত্রী নিগার সুলতানা এবং তাঁর শ্যালক শেখ আমিনুর রহমান। মঙ্গলবার দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।

দুদকের অনুসন্ধানে শেখ মামুন খালেদের নামে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে মোট ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৮৬ হাজার ৮৩৭ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয়ের হিসাব যুক্ত করে তাঁর মোট অর্জিত সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ কোটি ৩০ লাখ ৮০ হাজার ৬৫৮ টাকা।

দুদকের হিসাব অনুযায়ী, শেখ মামুন খালেদের গ্রহণযোগ্য আয় ৩ কোটি ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৫৬৩ টাকা। এই আয় ও সম্পদের হিসাব পর্যালোচনায় তাঁর নামে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৫ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী নিগার সুলতানার নামেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। অনুসন্ধান অনুযায়ী, তাঁর নামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৮ লাখ ৪৭ হাজার ৭৫১ টাকা।

নিগার সুলতানার গ্রহণযোগ্য আয় হিসেবে ১ কোটি ২৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯১১ টাকা পাওয়া গেছে। একই সময়ে পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় হিসেবে হিসাব করা হয়েছে ৭৪ লাখ ১৩ হাজার ৯৬৯ টাকা। এসব ব্যয় বাদ দেওয়ার পর সম্পদ অর্জনের জন্য তাঁর সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৯ লাখ ৭২ হাজার ৯৪২ টাকা।

এই হিসাবের ভিত্তিতে দুদক নিগার সুলতানার নামে ৫৮ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৯ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকার অভিযোগ করেছে।

শেখ আমিনুর রহমানের সম্পদের হিসাব আরও বড় বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। অনুসন্ধানে তাঁর নামে ১০ কোটি ৪২ লাখ ৯ হাজার ১২৩ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, শেখ আমিনুর রহমানের গ্রহণযোগ্য আয় ৫ কোটি ৭৭ লাখ ৩৭ হাজার ৪৭৮ টাকা। তাঁর পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ কোটি ৪২ লাখ ৪ হাজার ৬১৬ টাকা। ব্যয়সহ তাঁর মোট অর্জিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ২৭ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৩ টাকা।

এই হিসাবের বিপরীতে শেখ আমিনুর রহমানের নামে ৫ কোটি ৪৯ লাখ ৮৭ হাজার ৮৫৫ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকার অভিযোগ পেয়েছে দুদক।

অনুসন্ধানের সময় আয়কর নথিতে প্রদর্শিত কয়েকটি আয়ের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দুদক জানিয়েছে, নিগার সুলতানা ও শেখ আমিনুর রহমান তাঁদের আয়কর নথিতে মৎস্য চাষ থেকে যথাক্রমে ৪০ লাখ ৫৯ হাজার ৯৩০ টাকা এবং ৬ কোটি ৮ লাখ ১৪ হাজার ৮৮৪ টাকা আয় দেখিয়েছিলেন। তবে রেকর্ডপত্র যাচাই ও সরেজমিন পরিদর্শনে এসব আয়ের পক্ষে প্রয়োজনীয় ভিত্তি বা তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কমিশন।

এ ছাড়া শেখ আমিনুর রহমানের পূর্ববর্তী সঞ্চয় হিসেবে দেখানো ১ কোটি ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৩৯০ টাকারও কোনো সমর্থনকারী রেকর্ডপত্র পাওয়া যায়নি বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

দুদক জানিয়েছে, এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় পৃথক তিনটি মামলা করা হয়েছে। তিনটি মামলাতেই দুদকের সহকারী পরিচালক পিয়াস পাল বাদী হিসেবে মামলা দায়ের করেন।

দুদকের মামলা দায়েরের মধ্য দিয়ে শেখ মামুন খালেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদ ও আয়সংক্রান্ত বিষয়ে চলমান অনুসন্ধান এখন আইনি প্রক্রিয়ায় গড়াল। তবে মামলায় আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের দোষী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। গত ২৫ মার্চ রাতে ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে তাঁকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁর আর্থিক কর্মকাণ্ড ও সম্পদসংক্রান্ত বিষয়েও অনুসন্ধান চালায় দুদক।

দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের মে মাসে আদালত শেখ মামুন খালেদ ও তাঁর স্ত্রী নিগার সুলতানার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। ওই সময় তাঁদের আর্থিক অনিয়ম ও সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছিল।

এর আগে ২০০৮ সালের জুনে শেখ মামুন খালেদ ব্রিগেডিয়ার চৌধুরী ফজলুল বারির স্থলাভিষিক্ত হয়ে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিআইবি) পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

দুদকের সর্বশেষ মামলার তথ্য অনুযায়ী, তিন আসামির সম্পদ, আয়, ব্যয় এবং আয়কর নথিতে প্রদর্শিত বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু আয়ের উৎসের পক্ষে পর্যাপ্ত নথি না পাওয়ার বিষয়টিও অনুসন্ধানে গুরুত্ব পেয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের এ ধরনের অনুসন্ধান ও মামলা মূলত সরকারি বা বেসরকারি ব্যক্তির ঘোষিত আয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের অংশ। এখন মামলাগুলোর পরবর্তী আইনি কার্যক্রমে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে।

শেখ মামুন খালেদ, নিগার সুলতানা ও শেখ আমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে করা তিনটি মামলায় মোট কত পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ আনা হয়েছে, কোন সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং আয়কর নথিতে প্রদর্শিত কোন কোন তথ্য দুদক গ্রহণযোগ্য মনে করেনি—এসব বিষয়ই মামলার মূল অনুসন্ধানভিত্তিক অভিযোগের অংশ। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব অভিযোগের সত্যতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে।