বকশীগঞ্জ উপজেলায় পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে প্রস্তুত কোরবানির পশু ছবিঃ সংগৃহীত

পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে সারাদেশে কোরবানির পশুর খামারগুলোতে ব্যস্ততা তুঙ্গে উঠেছে। খামারিদের চোখেমুখে এখন সারা বছরের স্বপ্ন পূরণের আশা, তবে সেই আশার মেঘে ঢাকা পড়ছে দুশ্চিন্তার কালো ছায়া। গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি, ওষুধের উচ্চমূল্য এবং ব্যাংক ঋণের বোঝা—সব মিলিয়ে কোরবানির হাটে পশুর ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন প্রান্তিক খামারি থেকে শুরু করে বড় খামার মালিকরা।
নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার ছোট-বড় খামারগুলোতে এখন উৎসবের আমেজ থাকলেও ভেতরে চলছে নিরন্তর সংগ্রাম। উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের নাওদারা গ্রামের সফল খামারি হযরত আলী জানান, এবারের ঈদের জন্য তিনি ২৬টি গরু প্রস্তুত করেছিলেন। ইতোমধ্যে ৯টি গরু ঢাকার হাটে বিক্রি করলেও বাকি ১৭টি নিয়ে তিনি বেশ আশাবাদী। তার খামারে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ান, পঙ্করাজ, ব্রাহামা, শাহীওয়াল ও নেপালি জাতের বিশালকার সব গরু। তিন থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা দরে প্রতিটি গরু বিক্রির আশা করলেও উৎপাদন খরচ নিয়ে তিনি চিন্তিত। একই চিত্র দেখা গেছে সদর ইউনিয়নের চকলেঙ্গুরা এলাকার আজিজুল হকের খামারেও। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পশুদের গোসল করানো, উন্নত খাবার সরবরাহ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার পেছনে শ্রম দিচ্ছেন খামারের কর্মীরা। তাদের একমাত্র প্রার্থনা, বাজারে যেন ক্রেতার সংকট না হয়।
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ১৫৮টি খামারে দেশীয় ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে। তবে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা হওয়ায় এই অঞ্চলের খামারিদের প্রধান উদ্বেগের কারণ হলো ‘ভারতীয় গরুর অবৈধ অনুপ্রবেশ’। স্থানীয় খামারিদের দাবি, কষ্ট করে দেশি গরু পালন করার পর যদি সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে গরু ঢোকে, তবে তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন। গো-খাদ্য যেমন গমের ভুসি, খৈল এবং ওষুধের দাম গত বছরের তুলনায় অনেকটা বেড়েছে, যা উৎপাদন ব্যয়কে আকাশচুম্বী করে তুলেছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী তারা ক্ষতিকর ওষুধ পরিহার করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পশু পালন করলেও বাজারের অনিশ্চয়তা তাদের পিছু ছাড়ছে না।
বগুড়ার ধুনট উপজেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা মিটিয়েও বিপুল পরিমাণ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ দপ্তর। এখানে প্রায় ৬৬ হাজার ৩৪০টি পশু প্রস্তুত রয়েছে। তবে স্থানীয় বাজারে সরিষার খৈল কেজিপ্রতি ৪৮-৫০ টাকা এবং গমের ভুসি ৫০-৫৫ টাকায় বিক্রি হওয়ায় খামারিদের নাভিশ্বাস উঠছে। অনেকেই ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কিংবা জীবনের শেষ সম্বল পারিবারিক সঞ্চয় বিনিয়োগ করে খামার গড়ে তুলেছেন। ধুনটের খামারিরা জানান, গত বছরের তুলনায় প্রতি বস্তা খাবারে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে। এই বাড়তি খরচ বাজারে পশুর দামের সাথে সমন্বয় না হলে অনেক খামারি দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, এবার পশুর কোনো সংকট হবে না। খামারিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ উপায়ে পশু প্রস্তুত করতে পারেন। মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তারা নিয়মিত খামার পরিদর্শন করে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করছেন। তবে খামারিদের দাবি, শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং পশুর সঠিক বাজারজাতকরণ এবং ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখন গবাদি পশু পালনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ব্যাংক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে খামারিরা যে পরিশ্রম করছেন, তার ফসল ঘরে তুলতে হলে কোরবানির হাটে সিন্ডিকেট মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। যদি গো-খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং পশুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করা যায়, তবে ভবিষ্যতে এই সম্ভাবনাময় সেক্টর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন নতুন উদ্যোক্তারা। খামারিদের এখন একটাই চাওয়া— ‘কষ্টের ধন’ যেন হাটে সঠিক মূল্যে বিক্রি হয়।