ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪০ কিমি যানজট, অ্যাম্বুলেন্সেই প্রাণ গেল নারীর - Uttorpatro TV

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪০ কিমি যানজট, অ্যাম্বুলেন্সেই প্রাণ গেল নারীর

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 29, 2026

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটে আটকা পড়ে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা গেছেন আমিরুন্নেছা নামে এক নারী। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসার জন্য ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মহাসড়কে তীব্র যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার পর অ্যাম্বুলেন্সেই তার মৃত্যু হয়।

নিহত আমিরুন্নেছা লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার প্রাণভগবতীপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বজনদের দাবি, দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হলে হয়তো তাকে বাঁচানো যেত। কিন্তু মহাসড়কের ভয়াবহ যানজট তাদের সেই সুযোগ দেয়নি।

স্বজন তারেক আল হাসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন আমিরুন্নেছা। অবস্থার অবনতি হলে রাত ৮টার দিকে তাকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার উদ্দেশে নিয়ে বের হন স্বজনরা। লক্ষ্য ছিল দ্রুত রাজধানীর কোনো হাসপাতালে পৌঁছে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

কিন্তু ঢাকার পথে দাউদকান্দি এলাকায় পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। রাত ১১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সটি তীব্র যানজটে আটকা পড়ে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে গাড়িটি প্রায় একই জায়গায় আটকে ছিল। চার ঘণ্টার মতো সময় পেরিয়ে গেলেও যানজট থেকে বের হতে পারেনি অ্যাম্বুলেন্সটি।

একপর্যায়ে রাত সাড়ে ৩টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যেই আমিরুন্নেছার মৃত্যু হয়। অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার সময় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। তাদের ভাষ্য, সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে তার চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হতে পারত।

এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দীর্ঘ যানজটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরাও। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। একপর্যায়ে যানজট প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

যানজটের কারণে শুধু দূরপাল্লার বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িই নয়, জরুরি প্রয়োজনে চলাচলকারী অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যানবাহনও আটকা পড়ে। এতে রোগী পরিবহন ও জরুরি যাতায়াত নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।

কুমিল্লা থেকে ঢাকার বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে মনির হোসেন নামে এক যাত্রীও ভয়াবহ ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশে ঢাকায় রওনা হওয়া এই যাত্রী জানান, সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছাতে না পারার আশঙ্কায় তাকে বিভিন্ন যানবাহন পরিবর্তন করে এগোতে হয়েছে।

মনির হোসেন বলেন, কুমিল্লার চান্দিনা এলাকা থেকে অটোরিকশায় করে গৌরীপুর পর্যন্ত এসেছেন তিনি। তার দুপুর ১২টার মধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু মহাসড়কের যানজটের কারণে স্বাভাবিকভাবে ঢাকার দিকে এগোতে পারেননি।

যানজট এড়াতে একপর্যায়ে ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন যানবাহনে যাতায়াত করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। এতে চান্দিনা থেকে গৌরীপুর পর্যন্ত পৌঁছাতেই তার প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকা খরচ হয়েছে।

মনির হোসেনের ভাষ্য, মহাসড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ক্যামেরার নজরদারি থাকায় এবার অনেক চালক উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে যানজট এড়ানোর চেষ্টা করতে পারছেন না। ফলে যানবাহন নির্ধারিত লেনেই চলাচল করায় দীর্ঘ যানজটের মধ্যে আটকে থাকতে হচ্ছে বলে তিনি মনে করছেন।

তিনি জানান, প্রায় চার ঘণ্টা সময় ব্যয় করে কুমিল্লা থেকে গৌরীপুরে পৌঁছাতে পেরেছেন। কিন্তু সামনের দিকেও ছিল দীর্ঘ যানজট। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রেম দাস রায় জানান, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে মহাসড়কের যানজট কিছুটা কমে এসেছিল। তবে সাড়ে ১২টার পর পরিস্থিতি আবারও অবনতি হতে শুরু করে। দাউদকান্দি টোল প্লাজা থেকে ঢাকামুখী লেনে কুমিল্লার দিকে যানবাহনের চাপ ক্রমেই বাড়ছিল।

তিনি বলেন, যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হাইওয়ে পুলিশের একাধিক দল মহাসড়কে কাজ করছে। যানজটের কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।

ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি সাইফুল ইসলামও মহাসড়কের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, যানজট চান্দিনা এলাকা অতিক্রম করে বুড়িচং উপজেলার নিমসার এলাকার কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছেছে। ওই অংশে যানবাহন অত্যন্ত ধীরগতিতে চলাচল করছে।

পুলিশের একাধিক দল মহাসড়কে সক্রিয় রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যানজট নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যানবাহনের চাপ কমানো এবং সড়কে চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। ফলে কোনো একটি অংশে যানজট সৃষ্টি হলে দ্রুত তা আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে দীর্ঘ সময়ের যানজট শুধু যাত্রীদের সময় ও অর্থের ক্ষতি করে না, জরুরি রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। আমিরুন্নেছার মৃত্যু সেই ঝুঁকিকেই নতুন করে সামনে এনেছে। স্বজনদের অভিযোগ, একজন গুরুতর অসুস্থ রোগীকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর সুযোগ না থাকলে জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে।

সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতা চললেও দীর্ঘ যানজটের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স, বিদেশগামী যাত্রী এবং জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষদের জন্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন।

স্বজন হারানোর ঘটনায় আমিরুন্নেছার পরিবারে নেমে এসেছে শোক। একই সঙ্গে মহাসড়কের যানজট নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি যানবাহনের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার যানবাহন দ্রুত পার করে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।