জুলাই হত্যা মামলার আসামিরা কোথায়? ৩৫ এসপি ও ৬ এডিশনাল ডিআইজির নতুন পদে বহাল থাকার তথ্য - Uttorpatro TV জুলাই আন্দোলনের অভিযুক্ত ৩৫% পুলিশ কর্মকর্তা এখনো দায়িত্বে বহাল

জুলাই হত্যা মামলার আসামিরা কোথায়? ৩৫ এসপি ও ৬ এডিশনাল ডিআইজির নতুন পদে বহাল থাকার তথ্য

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 3, 2026
ছবিঃ উত্তরপত্র

ঢাকা: জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান দমনে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের একটি বড় অংশই নানা মাধ্যমে লবিং ও তদবির চালিয়ে নিজেদের পদ ও অবস্থান সুরক্ষিত রেখেছেন। ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে চিহ্নিত এসব কর্মকর্তার অনেককে বিচারের আওতায় না এনে উলটো বিভিন্ন দপ্তর ও ট্রেনিং সেন্টারে স্বাভাবিক পদায়ন দেওয়া হয়েছে।

যুগান্তরের অনুসন্ধানী তথ্যে দেখা গেছে, তৎকালীন সময়ে রেঞ্জ, মেট্রোপলিটন এবং জেলা পর্যায়ে এসপি, ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি পদে দায়িত্ব পালন করা ১১৬ জন কর্মকর্তার মধ্যে অন্তত ৪১ জন এখনো বহাল তবিয়তে চাকরি চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, অভ্যুত্থান দমনে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের ৩৫ শতাংশের বেশি এখনো স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করছেন, যা পুলিশ কাঠামোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের ৬৪টি জেলায় দায়িত্ব পালনকারী ৭৭ জন পুলিশ সুপারের (এসপি) মধ্যে ৩৫ জনই বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশ, সিআইডি, পিবিআই, নৌ পুলিশ, এপিবিএন এবং বিভিন্ন ইনসার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে স্বাভাবিক দায়িত্বে রয়েছেন। শতাংশের হিসাবে তৎকালীন দায়িত্বে থাকা এসপিদের ৪৫ শতাংশই কোনো ধরনের বড় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হননি।

অন্যদিকে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ৪২ জন বা ৫৪ শতাংশ এসপির বিরুদ্ধে বরখাস্ত কিংবা কার্যালয়ে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ১১ জন এসপির মধ্যে এ পর্যন্ত কারাগারে গেছেন মাত্র ৩ জন। তারা হলেন:

  • নোয়াখালীর তৎকালীন এসপি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান

  • কুমিল্লার সাবেক এসপি আব্দুল মান্নান

  • বাগেরহাটের সাবেক এসপি আবুল হাসনাত খান

এছাড়া নারায়ণগঞ্জের গোলাম মোস্তফা রাসেল, যশোরের প্রলয় কুমার জোয়ারদার, বগুড়ার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীসহ বেশ কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত ও সংযুক্ত করা হলেও তাদের একটি অংশ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে বা আত্মগোপনে রয়েছে।

আন্দোলন চলাকালে আটটি মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ও আটটি রেঞ্জের ডিআইজিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তথ্যানুযায়ী, তৎকালীন আট কমিশনার ও ছয় ডিআইজিকে ইতোমধ্যে অবসরে পাঠানো হয়েছে। তিন ডিআইজি ও এক কমিশনারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

একইভাবে ২১ জন অতিরিক্ত ডিআইজির মধ্যে ৬ জন কর্মকর্তা বর্তমানে নতুন পদায়নে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, তৎকালীন বরিশাল রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সিলেট রেঞ্জের এক অতিরিক্ত ডিআইজি বর্তমানে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সব মিলিয়ে অভিযুক্ত ১১৬ জন কর্মকর্তার মধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অবসরে পাঠানো সম্ভব হয়েছে মাত্র ১৭ জনকে, যা মোট সংখ্যার মাত্র ১৪ শতাংশ। বাকি ৫৭ জন কর্মকর্তাকে কেবল ‘সংযুক্ত’ রাখা হয়েছে, যাদের মধ্য থেকে পর্যায়ক্রমে বরখাস্ত বা অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্র-জনতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দমনে সরাসরি অংশ নেওয়া বা নির্দেশ দেওয়া কর্মকর্তাদের দায়িত্বে রাখাটা প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকি ও উদ্বেগের কারণ।

তাদের মতে, বিচারহীন অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে থাকা এসব কর্মকর্তা অনেকটা ‘বিষফোড়া’র মতো কাজ করছেন। তারা একদিকে যেমন প্রশাসনিক অনৈক্য তৈরি করছেন, অন্যদিকে পুলিশের অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ গোপনীয় তথ্য বাইরে পাচার করার মতো কর্মকাণ্ডেও জড়িত হতে পারেন। ফলে তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে সঠিক বিচারপ্রক্রিয়ার অধীনে আনা জরুরি।

বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদে বহাল থাকা এবং চলমান ব্যবস্থা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে অতিরিক্ত আইজিপি একেএম আওলাদ হোসেন জানান, ফ্যাসিবাদের সহায়তায় বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা কোনো কর্মকর্তাই রেহাই পাবেন না। তাদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ও তদন্তের ওপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ‘ইন্টারপোল’-এর রেড নোটিশ ও অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।