চট্টগ্রামজুড়ে আতঙ্ক, চাঁদাবাজি এবং একের পর এক দুর্ধর্ষ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারিগর শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’ অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন। আজ বুধবার সকালে যশোর জেলা এলাকার একটি স্থান থেকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাঁর সাথে থাকা আরও পাঁচজন সশস্ত্র সহযোগীকেও আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত প্রত্যেকেই পেশাদার শুটার।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে এই শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাঁর সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও সরঞ্জাম জব্দ করার প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। গত দুই বছর ধরে চট্টগ্রাম নগরী ও এর আশেপাশের এলাকায় প্রকাশ্য চাঁদাবাজি, হুমকি এবং গোলাগুলির ঘটনায় বারবার ইমনের নাম সামনে এসেছে।
ইমন কেবল সাধারণ অপরাধী নন, পুলিশি তথ্যানুযায়ী তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে পারেন। তাঁর কাছে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি ভারী ও হালকা আগ্নেয়াস্ত্রের একটি সংগ্রহ ছিল বলে পুলিশের ধারণা। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের পেছনে অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন এই ইমন। ওই হত্যাকাণ্ডে মোটরসাইকেল ভাড়া করা থেকে শুরু করে শুটার বা ভাড়াটে খুনিদের সমন্বয়ের দায়িত্ব তিনি নিজেই পালন করেছিলেন। এছাড়া একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যা মামলাসহ তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র আইন ও চাঁদাবাজির অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশে আত্মগোপনে থাকা চট্টগ্রামের আরেক চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর নির্দেশনায় ইমন বাংলাদেশে তাঁর অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করে আসছিলেন।
পূর্বে বাংলাদেশে বড় সাজ্জাদের এই নেটওয়ার্কের মূল নেতৃত্বে ছিলেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ‘ছোট সাজ্জাদ’। কিন্তু ছোট সাজ্জাদ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে বন্দি থাকায়, সেই নেটওয়ার্কের পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ডেভিড ইমন এবং তাঁর অন্য সহযোগী মোহাম্মদ রায়হানের হাতে। রায়হানের বিরুদ্ধেও হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ অন্তত আটটি মামলা রয়েছে।
পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের নামে চট্টগ্রামে বর্তমানে অন্তত ৫০ জন শুটার ও ক্যাডার সক্রিয় রয়েছে। রায়হান ও ইমন সরাসরি বিদেশ থেকে পাওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও সাধারণ মানুষের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিলেন।
অতি সম্প্রতি ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সাধারণ মানুষকে দেওয়া ইমনের হুমকির কিছু চাঞ্চল্যকর অডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আসে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ‘এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা’ চাঁদা দাবি করার মতো অভিযোগ রয়েছে ইমনের বিরুদ্ধে। এমনকি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘরে ঢুকে হত্যা করার হুমকি দিতেও পিছপা হতো না এই দুর্ধর্ষ ক্যাডার।
দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ মানুষ এই সন্ত্রাসী বাহিনীর কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করলেও প্রতিবারই স্থান পরিবর্তন করে ইমন ও তাঁর সঙ্গীরা অধরা থেকে যেতেন। অবশেষে যশোর থেকে তাঁদের এই গ্রেপ্তারের ঘটনায় চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী মহলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং তাদের সাথে যুক্ত থাকা বাকী সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে।