সদ্য পদত্যাগ করা ভারতের সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে এখন আলোচনার ঝড় উঠেছে। পদে থাকাকালে সাংবিধানিক দায়মুক্তি পেলেও পদত্যাগের পরপরই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, এবং ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের অভিযোগগুলো পুনরায় সামনে আসছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক দখলে এস আলম গ্রুপকে অবৈধ সুবিধা দেওয়া, ৮০ হাজার কোটি টাকার শেয়ার কেলেঙ্কারি এবং বিদেশে অঢেল সম্পদ গড়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ বা পদত্যাগের পর তাঁর পূর্ববর্তী অপরাধের বিচার করা যাবে কি না।
হাইকোর্টে দাখিল করা বিএফআইইউ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের পেছনে মো. সাহাবুদ্দিন ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ‘জেএমসি বিল্ডার্স’-এর প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পূর্বপর্যন্ত তিনি জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এই শেয়ার হস্তান্তরে অনুমোদন দেন। আইনজীবী শিশির মনিরের তথ্যমতে, প্রায় ২৪টি কোম্পানির নাম ব্যবহার করে এই শেয়ার জালিয়াতি ও ঋণ অনিয়ম সংঘটিত হয়, যা বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
বিসিএস বিচার ক্যাডারের সাবেক কর্মকর্তা মো. সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পর্যবেক্ষণ মহলের মতে, এই সময়টিতেই তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং বড় বড় অনিয়ম ধামাচাপা দিতে ভূমিকা রাখেন।
পদ্মা সেতু বিতর্ক: বিশ্বব্যাংক উত্থাপিত পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত না করে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এস আলম গ্রুপকে সুরক্ষা: এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা উঠিয়ে বিদেশে পাচারের অভিযোগ থাকলেও দুদক কমিশনার হিসেবে সাহাবুদ্দিন কোনো আইনি পদক্ষেপ নেননি।
বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি: ২০১৫ সালে বেসিক ব্যাংকের ২,০৩৭ কোটি টাকা হরিলুটের ঘটনায় মূল কারিগর শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ও পর্ষদকে বাদ দিয়ে চার্জশিট গঠনে চরম রাজনৈতিক চাপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এছাড়াও তিনি এস আলম নিয়ন্ত্রিত এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবেও আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক অনুকম্পায় একের পর এক পদ বাগিয়ে নিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাজধানী গুলশানে একাধিক ফ্ল্যাট ছাড়াও বিদেশে তাঁর বিপুল বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে:
মালয়েশিয়া: ‘মাই সেকেন্ড হোম’ প্রকল্পের আওতায় অন্তত দেড় লাখ মালয়েশিয়ান রিংগিত বিনিয়োগ করে রেসিডেন্সি সুবিধা লাভ।
দুবাই: গোপন ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং ‘ওয়ারাদ জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি’ নামক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব।
তাঁর স্ত্রী ড. রেবেকা সুলতানা এবং পুত্র মো. আরশাদ আদনানের নামেও বিপুল সম্পদের তথ্য মিলেছে, যার মধ্যে আদনানের আলোচিত চলচ্চিত্র ‘প্রিয়তমা’ ও ‘রাজকুমার’-এ বড় অংকের বিনিয়োগের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন সময়ে ফৌজদারি মামলা বা আইনি পদক্ষেপ থেকে দায়মুক্তি পান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংবিধানের এই প্রাক-শর্ত কেবল রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু রাষ্ট্রপতির আসনে বসার আগের কর্মজীবন (যেমন: দুদক কমিশনার, বিচারক বা ব্যাংকের পরিচালক থাকা অবস্থায়) যদি কোনো গুরুতর অপরাধ বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়ে থাকে, তবে সেটির স্বচ্ছ তদন্ত ও বিচার হওয়া বাঞ্ছনীয়।
তবে এ বিষয়ে সরকারের দুই মন্ত্রীর পক্ষ থেকে দ্বিধাবিভক্ত বক্তব্য পাওয়া গেছে। একদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতির ‘ইনডেমনিটি’ বা দায়মুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, অন্যদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, দুদক ও ইসলামী ব্যাংকে দায়িত্বপালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে সরকার এবং তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সাবেক এই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না হলে দেশে দুর্নীতির প্রবণতা আরও উৎসাহিত হবে। শেষ পর্যন্ত মো. সাহাবুদ্দিন ও তাঁর পরিবারের আইনি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।