বিদ্যুৎ বিতরণ যাচ্ছে বেসরকারি খাতে: জ্বালানিসংকট নিরসনে সরকারের বড় নীতিগত পদক্ষেপ - Uttorpatro TV বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি খাতে দেওয়ার ঘোষণা | জ্বালানি নীতি ও সংকট

বিদ্যুৎ বিতরণ যাচ্ছে বেসরকারি খাতে: জ্বালানিসংকট নিরসনে সরকারের বড় নীতিগত পদক্ষেপ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: July 22, 2026
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শিরোনামে আয়োজিত পলিসি কনক্লেভে বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। আজ বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলেছবি: তানভীর আহাম্মেদ

দেশের বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে এ কথা জানান। দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, সরকারের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পাইকারি পর্যায়ে এর সরবরাহ নিশ্চিত করা। খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবসায় রাষ্ট্রের যুক্ত থাকা উচিত নয়।

ভারতের মুম্বাই ও দিল্লির উদাহরণ টেনে মন্ত্রী বলেন, সেখানে রিলায়েন্স ও আদানির মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ বিতরণ পরিচালনা করছে। বাংলাদেশেও বিতরণ খাত বেসরকারি খাতে গেলে সরকারের অর্থনৈতিক দায় অনেকাংশে কমবে। এ লক্ষ্যে দেশের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই সরকারি খরচে নতুন প্রকল্প না করে এসব খাত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন।

জ্বালানিসংকট ও শিল্প খাতের চরম ভোগান্তি

কনক্লেভের বিভিন্ন অধিবেশনে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং নীতি-নির্ধারকেরা দেশের বর্তমান জ্বালানিসংকট ও এর প্রভাবে শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ব্যবসায়ীরা জানান, বিনিয়োগ অনুমোদন পাওয়ার পরও শুধু গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংযোগের অভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার মূলধন আটকে আছে।

ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের (আইসিসি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে কেন্দ্র ভাড়া বা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বাবদ হাজার হাজার কোটি টাকা অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পরিশোধ করতে হচ্ছে, যার পুরো বোঝা চাপছে সাধারণ জনগণের ওপর।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) সহসভাপতি ও ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান শিল্পের গুণগত মানের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরেন। বিশেষ করে ওষুধশিল্পের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সঠিক ভোল্টেজ না থাকলে কোটি কোটি টাকার ওষুধ নষ্ট হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ উৎপাদনে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিভ্রাট বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে।

অন্যদিকে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল তিতাসের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার তীব্র সমালোচনা করে জানান, গ্যাস না পেয়ে শিল্প দেউলিয়া হলে হাজার হাজার কর্মী চাকরি হারাবেন। ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী শুল্ক ও নীতি প্রণয়নে স্বচ্ছতার ওপর জোর দেন এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী জানান, শুধু তাঁদের ব্যাংকেরই ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ গ্যাস-সংকটের কারণে আটকে গেছে।

‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শিরোনামে আয়োজিত পলিসি কনক্লেভের মঞ্চে আলোচকেরা। আজ বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলেছবি: তানভীর আহাম্মেদ

সংকট নিরসনে সরকারের ব্যাখ্যা ও চ্যালেঞ্জ

ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের জবাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী দেশের আমদানিনির্ভরতার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, বিগত ১৭ বছরে দেশে পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না বানিয়ে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে খুলনায় তিনটি বড় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে আছে।

মন্ত্রী জানান, বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে ৬৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া জমে আছে এবং ক্যাপাসিটি চার্জের সার্বভৌম গ্যারান্টি থাকায় রাষ্ট্র তা পরিশোধে বাধ্য। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভর্তুকির চাপ অনেক বেড়েছে। তবে বকেয়া পরিশোধ ও পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে বিশেষ কমিটি গঠন করেছে বলে জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সুপারিশ

কনক্লেভে উপস্থিত দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা টেকসই সমাধানের জন্য একাধিক সংস্কারের প্রস্তাব দেন:

  • বিশ্বব্যাংকের বক্তব্য: বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম জানান, বাংলাদেশের গ্যাস চাহিদার ৩০ শতাংশ, তেলের ৯৫ শতাংশ এবং কয়লার ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সরাসরি অর্থনীতিকে আঘাত করছে।

  • বিইআরসির মতামত: বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ দ্রুত নবায়নেযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার তাগিদ দেন।

  • গ্যাস অনুসন্ধানের তাগিদ: আইইউবি-র উপাচার্য ও সাবেক বুয়েট অধ্যাপক ম তামিম জানান, প্রাথমিক জ্বালানির আমদানিনির্ভরতাই সব সমস্যার মূলে। সৌরশক্তি এবং অন্যান্য বিকল্প উৎসের সমন্বিত ব্যবহার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্ভব নয়।

সর্বোপরি, সরকারের বিদ্যুৎ বিতরণ খাতকে বেসরকারি রূপান্তরের পদক্ষেপ এবং শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করার দাবিকে কেন্দ্র করে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি বড় দিকনির্দেশনা ফুটে উঠেছে এই পলিসি কনক্লেভে।