ফাইনালে স্পেনের কাছে বিধ্বস্ত আর্জেন্টিনা: কাঠগড়ায় স্কালোনির কৌশল ও বিদায়ের ইঙ্গিত - Uttorpatro TV স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার ফাইনাল হার, কোচ লিওনেল স্কালোনির বিদায়ের ইঙ্গিত

ফাইনালে স্পেনের কাছে বিধ্বস্ত আর্জেন্টিনা: কাঠগড়ায় স্কালোনির কৌশল ও বিদায়ের ইঙ্গিত

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: July 20, 2026
আর্জেন্টিনা দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি-এএফপি

বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ফাইনাল শেষে ফুটবল বিশ্ব যখন স্পেনের উদযাপনে মাতোয়ারা, তখন আর্জেন্টিনার ডাগআউটে নেমে এসেছে অন্ধকারের ছায়া। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না আলবিসেলেস্তেদের হেড কোচ লিওনেল স্কালোনি। ভরা সংবাদ কক্ষেই তাঁর চোখের জল বাঁধ মানেনি। হারের বেদনার পাশাপাশি এই সফল কোচ আভাস দিয়েছেন এক বড় সিদ্ধান্তের। আগামী ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি আর লিওনেল মেসিদের দায়িত্ব ট্রেইনার হিসেবে থাকবেন কি না, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে জানান তিনি। তবে আবেগি এই বিদায়ী সুরের সমান্তরালে স্কালোনির দিকে ধেয়ে আসছে এমন কিছু কঠিন প্রশ্ন, যার উত্তর দেওয়া তাঁর জন্য বেশ অস্বস্তিকর।

কৌশলগত ব্যর্থতা ও ফাইনালের দুঃস্বপ্ন স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স ছিল এককথায় ছন্নছাড়া। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই আর্জেন্টিনা যে খুব একটা দৃষ্টিনন্দন ও আনন্দদায়ী ফুটবল উপহার দিতে পেরেছে, তা বলা যাবে না। তবে গ্রুপ পর্ব ও নকআউটের বাধা পেরিয়ে তারা ফাইনালে এসেছিল মূলত খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেনা গল্প তৈরি করে। কিন্তু ফাইনালের মঞ্চে স্প্যানিশ আর্মাডার সামনে সেই লড়াকু মানসিকতার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি।

ম্যাচের একপর্যায়ে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়াকে স্কালোনি অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতেই পারেন, কিন্তু একজন কম নিয়েও গোল হজম করার পর আর্জেন্টিনার যে মরিয়া চেষ্টা দেখা গেছে, তা কেন শুরু থেকে অনুপস্থিত ছিল—সেই রহস্য মেলেনি। বিশ্বকাপ ফাইনালের সুদীর্ঘ ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে প্রতিপক্ষের বক্সে একটি শটও নিতে না পারার মতো লজ্জাজনক রেকর্ডের মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা। স্পেনের অর্ধে পুরো ম্যাচে মাত্র ৩৭ বার বল স্পর্শ করতে পেরেছে আলবিসেলেস্তেরা, যা টুর্নামেন্টের অন্য যেকোনো রক্ষণাত্মক দলের চেয়েও কম। এমন চরম পরিকল্পনাহীন ফুটবল নিয়ে এখন ফুটবল মহলে তীব্র সমালোচনা চলছে।

একাদশ নির্বাচন ও খেলোয়াড় উপেক্ষার বিতর্ক ফাইনালে স্কালোনির শুরুর একাদশ নিয়েই সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম হয়েছে। সেমিফাইনালের জয়ী কম্বিনেশন ভেঙে লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও জুলিয়ানো সিমিওনেকে বেঞ্চে বসিয়ে তিনি নামিয়েছিলেন নিকো গঞ্জালেজ ও অফ-ফর্মে থাকা রদ্রিগো দি পলকে। ম্যাচের প্রথমার্ধেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে দ্বিতীয়ার্ধে গঞ্জালেজকে তুলে নেন স্কালোনি। কিন্তু তাঁকে দিয়ে আসলে কী করাতে চেয়েছিলেন, তা বোদ্ধাদের কাছেও পরিষ্কার নয়। অন্যদিকে কাতার বিশ্বকাপের ভরসা দি পল এবার ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে, যাকে ম্যাচের ৭০ মিনিটে তুলে নিতে বাধ্য হন কোচ।

সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল লাওতারো মার্তিনেজের অনুপস্থিতি। কোয়ার্টার ফাইনাল এবং সেমিফাইনালে দলের ত্রাতা হয়ে ওঠা এই স্ট্রাইকারকে ফাইনালে এক মিনিটের জন্যও মাঠে নামানো হয়নি। অথচ হেডের দক্ষতা এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে প্রেসিং করার সামর্থ্যে লাওতারো এই মুহূর্তে সেরা ফর্মে ছিলেন।

তরুণ প্রতিভাদের সাইডবেঞ্চে বসিয়ে রাখার দায়ও এড়াতে পারবেন না স্কালোনি। ইতালিয়ান ‘সিরি আ’তে ১২ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করে কোমোকে চ্যাম্পিয়নস লিগে তোলা এবং লিগের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়া নিকো পাজ পুরো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ৭২ মিনিট। যার বড় অংশই ছিল জর্ডানের বিপক্ষে এক গুরুত্বহীন ম্যাচে। ফ্রেঞ্চ লিগে দারুণ মৌসুম কাটানো ভ্যালেন্টিন বার্কোকেও ডাগআউটে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। অথচ মাঝমাঠ যখন খাবি খাচ্ছিল, তখন জিওভানি লো চেলসোর মতো অভিজ্ঞ কিংবা এমিলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মতো ইনফর্ম মিডফিল্ডারদের দলে না রাখা বা ব্যবহার না করার চড়া মাশুল দিতে হলো আর্জেন্টিনাকে।

অতীতের সাহসী স্কালোনি বনাম বর্তমানের রক্ষণাত্মক রূপ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের পর এই স্কালোনিই চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে দলের খোলনলচে বদলে ফেলেছিলেন। এনজো ফার্নান্দেজ ও হুলিয়ান আলভারেজের মতো তরুণদের ওপর আস্থা রেখে বিশ্বজয় করেছিলেন। কিন্তু চার বছর পর তিনি যেন বড্ড বেশি রক্ষণাত্মক ও চেনা ছকে বন্দি হয়ে পড়লেন। আনহেল দি মারিয়ার অবসরের পর দলের আক্রমণভাগে যে গতি কমেছে, তা কাটিয়ে ওঠার কোনো বিকল্প ট্রানজিশন প্ল্যান কোচের ছিল না। বল পজেশন ধরে রাখা কিংবা দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার কোনো রণকৌশলই মাঠে বাস্তবায়ন করতে পারেনি আর্জেন্টিনা।

মেসির জাদুকরী ফর্ম এবং অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে ফাইনাল পর্যন্ত এলেও, শেষ রক্ষা আর হলো না। চার বছর আগে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালের সেই নান্দনিক ফুটবলের বিপরীতে এই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক কালো অধ্যায় হয়ে রইল। আর এর ফলেই কান্নার আড়ালে স্কালোনির বিদায়ের এই সুর হয়তো দায়িত্ব থেকে বাঁচবার এক নীরব প্রয়াস বলেই মনে করছেন অনেকে।