ছবি- উত্তরপত্র টিভি

বাংলাদেশ পুলিশের ইউনিফর্মে আবারও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিতর্কিত ‘আইরন’ বা লোহা রঙ বাদ দিয়ে বাহিনীটির ঐতিহ্যবাহী রূপ ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যদের শার্টে আবারও ফিরছে গাঢ় নীল ও হালকা জলপাই (লাইট অলিভ) রঙের চিরচেনা সংমিশ্রণ। তবে এবার সব পর্যায়ের সদস্যদের জন্য ট্রাউজার বা প্যান্টের রঙ নির্ধারণ করা হয়েছে ‘খাকি’।
‘পুলিশ ড্রেস রুলস, ২০২৫’ সংশোধন করে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এই সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। পুলিশ আইন, ১৮৬১-এর ১২ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।
নতুন গেজেটের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের কাজের সুবিধার্থে পোশাকে কিছুটা ভিন্নতা রাখা হয়েছে। ১. জেলা ও অন্যান্য ইউনিট: ঢাকা মহানগর বা অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকা বাদে দেশের সকল জেলা পুলিশ এবং অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিটের সদস্যদের জন্য গাঢ় নীল রঙের টিসি (সাধারণ বুননের) কাপড়ের শার্ট নির্ধারিত হয়েছে। ২. মহানগর পুলিশ (মেট্রোপলিটন): ডিএমপিসহ দেশের সব মহানগর পুলিশের ক্ষেত্রে শার্টের রঙ হবে ‘লাইট অলিভ’ বা হালকা জলপাই রঙের। ৩. ট্রাউজার বা প্যান্ট: পূর্বে নির্ধারিত কফি রঙের ট্রাউজার সম্পূর্ণ বাতিল করে সব ইউনিটের সকল স্তরের পুলিশ সদস্যদের জন্য একই রঙের ‘খাকি’ ট্রাউজার পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নতুন এই প্রজ্ঞাপনে কেবল গ্রীষ্মকালীন পোশাকই নয়, বরং শীতকালীন এবং নারী পুলিশ সদস্যদের পোশাকেও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে নির্ধারিত আইরন রঙের জ্যাকেট, জার্সি, কার্ডিগান ও পুলওভার পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। এখন থেকে জেলা পুলিশের সদস্যরা গাঢ় নীল রঙের এবং মহানগর পুলিশের সদস্যরা লাইট অলিভ রঙের জ্যাকেট ও শীতকালীন অনুষঙ্গ ব্যবহার করবেন।
অন্যদিকে, নারী পুলিশ সদস্যদের ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিয়ে জেলা পুলিশসহ অধিকাংশ ইউনিটের নারী সদস্যদের জন্য গাঢ় নীল শাড়ি এবং গাঢ় নীল ব্লাউজ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মহানগর পুলিশের নারী সদস্যরা গাঢ় নীল শাড়ির সঙ্গে লাইট অলিভ রঙের ব্লাউজ পরিধান করবেন। মুসলিম নারী সদস্যদের জন্য অনুমোদিত হেড কভার বা হিজাবের রঙও হবে গাঢ় নীল।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের সামগ্রিক সংস্কারের দাবি ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় বিগত ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তৎকালীন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘আইরন’ বা লোহা রঙের একটি সম্পূর্ণ নতুন ইউনিফর্ম প্রবর্তন করা হয়, যা গত বছরের ২৫ নভেম্বর থেকে মাঠপর্যায়ে পরা শুরু করেন পুলিশ সদস্যরা।
তবে নতুন এই পোশাকটি চালুর পর থেকেই মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই লোহা রঙের পোশাকটি নিয়ে ব্যাপক ট্রল ও নেতিবাচক মন্তব্য তৈরি হয়, যা ডিউটিরত পুলিশ সদস্যদের মানসিকভাবে অস্বস্তিতে ফেলে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের একাংশের দাবি ছিল, এই পোশাকটি দেখতে যেমন দৃষ্টিনন্দন নয়, তেমনি এটি পুলিশের ঐতিহ্যবাহী পেশাদারিত্বের সঙ্গে মানানসই ছিল না। এছাড়া অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাকের সাথে রঙের সাদৃশ্য থাকায় সাধারণ মানুষের পক্ষে পুলিশকে আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
পরবর্তীতে দেশের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এই পোশাকটি পুনর্বিবেচনার জন্য আইজিপির কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানো হয়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, পূর্বের পোশাক নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবহাওয়া, পুলিশ সদস্যদের গায়ের রঙ এবং মাঠপর্যায়ের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এই যৌক্তিক দাবির মুখেই মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও ইউনিফর্মের রঙ বদলানোর সিদ্ধান্ত নিল পুলিশ সদর দপ্তর।
প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, পুলিশের কিছু বিশেষায়িত ইউনিট এই নতুন পোশাক নীতির আওতামুক্ত থাকবে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়ন (এসপিবিএন), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), সিআইডি এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর বর্তমান পোশাকে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তারা আগের নিয়মেই তাদের নিজস্ব ইউনিফর্ম ব্যবহার করবেন।
সরকারের এই নতুন যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মাঝে আবার স্বস্তি ফিরবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। খুব দ্রুতই এই নতুন গেজেট অনুযায়ী নতুন পোশাক তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।