আজ শনিবার রাত আটটার দিকে মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডের একটি বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় ছবি: পুলিশের সৌজন্যে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার অন্যতম সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মো. হাসিবুর রশীদকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে তাঁকে আইনের আওতায় আনা হলো।
আজ শনিবার রাত আনুমানিক আটটার দিকে ঢাকা মহানগরীর মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডের একটি আবাসিক ভবন থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মোহাম্মদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই সাবেক এই উপাচার্য গ্রেপ্তার এড়াতে দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করেছিলেন। শনিবার রাতে মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডের একটি বাসায় তাঁর অবস্থানের খবর পান স্থানীয় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। এরপর তাঁরা সেখানে গিয়ে অধ্যাপক হাসিবুর রশীদকে সনাক্ত ও আটক করে পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
এডিসি জুয়েল রানা গণমাধ্যমকে বলেন, “অধ্যাপক হাসিবুর রশীদ শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত একজন পলাতক আসামি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। শনিবার রাতে স্থানীয় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাঁকে দেখতে পেয়ে আটকে রাখেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাঁকে হেফাজতে নেয়।”
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায় পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নিহত হওয়ার ঘটনাটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। চলতি বছরের ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই ঐতিহাসিক মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায়ে মামলার মোট ৩০ জন আসামির মধ্যে ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে ঘটনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়া তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মো. হাসিবুর রশীদকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর আগে গত বছরের ৩০ জুন আদালত তাঁর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। তবে রায় ঘোষণার সময় এবং এর পূর্ব থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন।
অধ্যাপক মো. হাসিবুর রশীদ মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (MIS) বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন। ২০২১ সালের জুন মাসে তৎকালীন সরকার তাঁকে চার বছরের মেয়াদে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বে ছিলেন।
আন্দোলন চলাকালে ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন সমন্বয়ক আবু সাঈদ। এই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য হিসেবে হাসিবুর রশীদের ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ছাত্র-জনতার তীব্র প্রতিবাদের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই তিনি গা ঢাকা দেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত সাবেক এই উপাচার্যকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে দ্রুতই আদালতে সোপর্দ করা হবে এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। দীর্ঘদিন পর এই মামলার অন্যতম শীর্ষ আসামির গ্রেপ্তারের খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিক সমাজ।