ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় ৬০ বাংলাদেশি: বেনজীরের গ্রেফতারের পর নতুন তথ্য - Uttorpatro TV ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড তালিকায় ৬০ বাংলাদেশি অপরাধী | Interpol Wanted List

ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় ৬০ বাংলাদেশি: বেনজীরের গ্রেফতারের পর নতুন তথ্য

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 18, 2026
ছবিঃ সংগৃহীত

অনলাইন ডেস্ক, ১৮ জুন ২০২৬: সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতার হওয়ার পর আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ‘ইন্টারপোল’ (Interpol) এবং তাদের রেড নোটিশের বিষয়টি নতুন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারপোলের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের মোস্ট ওয়ান্টেড বা মোস্ট সায়েন্টিফিক ট্র্যাকিং তালিকায় বর্তমানে ৬০ জন বাংলাদেশির নাম রয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে এই তালিকায় ওয়ান্টেড অপরাধীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৪৪৪ জনে।

তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত আসামির প্রকৃত সংখ্যা এই তালিকার চেয়ে অনেক বেশি। কৌশলগত কারণে সব অপরাধীর নাম এবং ছবি তাদের প্রকাশ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। কিন্তু জারি করা প্রতিটি রেড নোটিশই সংস্থার অন্তর্ভুক্ত সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্কে সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকে, যাতে অপরাধী কোনো দেশের সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করলেই তাকে সনাক্ত করা যায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হলেও ইন্টারপোলের মূল ওয়েবসাইটের প্রকাশ্য ওয়ান্টেড তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আন্তর্জাতিক তদন্তকারী সংস্থাগুলোর একটি বিশেষ কৌশল হলো—কিছু হাই-প্রোফাইল অপরাধী যাতে আন্তর্জাতিক চাপ টের পেয়ে আরো বেশি আড়ালে বা গা-ঢাকা দেওয়ার সুযোগ না পায়, সেজন্য তাদের তথ্য সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় না। তবে এই গোপনীয়তা সত্ত্বেও আমিরাতের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতায় তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

ইন্টারপোলের তথ্য অনুযায়ী, তালিকায় থাকা ৬০ জন বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মানবপাচার, খুন, অস্ত্র চোরাচালান, জালিয়াতি এবং অর্থ তছরুপের মতো মারাত্মক সব অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। শুধু বাংলাদেশ সরকারই নয়, বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, প্রতিবেশী ভারত, মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোও এই বাংলাদেশিদের খুঁজছে।

  • সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ আফ্রিকা: সিঙ্গাপুর সরকার হত্যা মামলার আসামি হিসেবে চাঁদপুর সদরের রাজু ঢালীকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। এছাড়া আফ্রিকার দেশ ইসওয়াতানিতে হত্যা ও খুনের চেষ্টার অভিযোগে ঢাকার মো. মিলন এবং লিটন ব্যাপারীর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় খুনের দায়ে ওয়ান্টেড তালিকায় আছেন নোয়াখালীর মিজান মিয়া।

  • ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: ভারতের আইন অনুযায়ী মুদ্রা জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগে খুলনার আজিজুর রহমান, অজয় বিশ্বাস ও তরিকুল ইসলাম, গোপালগঞ্জের আব্দুল আলীম শরীফসহ বেশ কয়েকজনকে খুঁজছে ভারতীয় পুলিশ। অন্যদিকে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনের কারণে আলহাজ মো. শফীকুল ইসলামের নামও রয়েছে ভারতের তালিকায়। এছাড়া জাহিদুল ইসলামকে যৌন নির্যাতন এবং ফজলুল আমীন জাভেদকে অস্ত্র মামলায় খুঁজছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা।

  • ইউরোপ ও এশিয়া: ইউরোপের দেশ বেলজিয়াম লক্ষ্মীপুরের খোরশেদ আলমকে খুনের মামলায় এবং মালয়েশিয়া সরকার ফেনীর আলা উদ্দিন ও নাটোরের সিরাজ মোস্তফাকে যথাক্রমে খুন ও চোরাচালানের অভিযোগে খুঁজছে। মালদ্বীপ সরকার খুঁজছে অর্থ আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত হানিফ নামের এক বাংলাদেশিকে।

বাংলাদেশের মাটিতে বিভিন্ন অপরাধ ঘটিয়ে যারা বিদেশে রাজনৈতিক বা অবৈধ আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহায়তা চেয়েছে ঢাকা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি ও রাজনৈতিক অপরাধের সাথে যুক্ত খন্দকার আব্দুর রশীদ, রাশেদ চৌধুরী ও শরীফুল হক ডালিম।

এছাড়াও রয়েছে দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও আলোচিত খুনের মামলার আসামি যেমন—ঢাকার জিসান আহমেদ, বগুড়ার কালা জাহাঙ্গীর ফেরদৌস, টাঙ্গাইলের মোহাম্মদ তাজউদ্দীন, চট্টগ্রামের সাজ্জাদ হোসেন খান এবং বরিশালের সাবেক ছাত্রনেতা গোলাম ফারুক অভি।

সাম্প্রতিক সময়ে মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে ফেলে তরুণদের বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখানো, জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় এবং হত্যার অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ওয়ারেন্ট জারি করেছে। এই তালিকায় রয়েছেন কিশোরগঞ্জের জাফর ইকবাল, স্বপন, মিন্টু মিয়া, তানজীরুল এবং মাদারীপুরের মোল্লা নজরুল ইসলাম। এর বাইরে আধুনিক সাইবার অপরাধ তথা পর্নোগ্রাফির অভিযোগে টাঙ্গাইলের ওয়াসিম এবং জালিয়াতির মামলায় জামালপুরের আমানুল্লাহ শফিক ও আতাউর রহমানকে খুঁজছে দেশীয় প্রশাসন।

১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ পুলিশ সংস্থা বা ইন্টারপোলের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১৯৬টি দেশ। বিশ্বকে অপরাধমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে এবং সীমানা পেরিয়ে পালিয়ে যাওয়া আসামিদের বিচারের মুখোমুখি করতে সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে পুলিশি নেটওয়ার্কের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাও এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে পলাতক আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।