দেশের অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে পুরোনো বা প্রথাগত পদ্ধতিতে আর দেশ চালানো সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের পুরো কাঠামোই এখন বদলে গেছে। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে প্রথম আলো আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এবং পুরো আয়োজনটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন।
ঋণের জন্য বিদেশি সংস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার মানসিকতা পরিবর্তন করার তাগিদ দিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রশ্ন তোলেন, “মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার আশায় আমরা কেন বারবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পেছনে দৌড়াব? তার চেয়ে আমরা কি পারি না নিজস্ব দেশের বাজারে একটা শক্তিশালী তহবিল বা ফান্ড গঠন করতে? বিনিয়োগের বিপরীতে যখন ভালো রিটার্ন বা মুনাফা আসবে, তখন কে কবে আমাদের শর্তযুক্ত টাকা দেবে, সেই আশায় বসে থাকার তো কোনো প্রয়োজন নেই।”
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান সরকারের মূল দর্শন হলো ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’। দেশ থেকে অলিগার্ক বা গুটিকয়েক মানুষের নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি পুরোপুরি উপড়ে ফেলা হবে। লক্ষ্য হলো এমন একটি অংশগ্রহণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ পাবেন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির সুফল তৃণমূলের সবার কাছে পৌঁছাবে।
দেশের একটি বড় সৃজনশীল ও অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠী করের আওতার বাইরে রয়ে গেছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রামে-গঞ্জের কামার, কুমার, তাঁতি কিংবা ক্ষুদ্র কারুশিল্পীরা কখনোই জাতীয় বাজেটের মূল ভাবনায় আসেননি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা কঠোর পরিশ্রম করলেও তাঁদের জীবনের মানোন্নয়ন হয়নি, কারণ তাঁদের পণ্যে আধুনিক মূল্য সংযোজন হচ্ছে না। আগামী বাজেটে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার তহবিল রাখা হবে।
সাংস্কৃতিক খাত ও থিয়েটারকে অর্থনীতির মূল ধারায় আনার পরিকল্পনা জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা ও দেশের বড় শহরগুলোতে বিশেষ ‘থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে তোলা হবে। নিজ দেশের সংস্কৃতি বা ‘সফট পাওয়ার’ শক্তিশালী করতে না পারলে বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন। পাহাড়ি অঞ্চলের এক সাধারণ চিত্রশিল্পীর উদাহরণ দিয়ে তিনি বোঝান, কীভাবে সঠিক প্ল্যাটফর্ম ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে ৫ হাজার টাকার একটি ছবি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় বিক্রি করে জিডিপিতে অবদান রাখা সম্ভব। এই বিশাল সম্ভাবনাময় জনগোষ্ঠীকে বাজেটের কাঠামোর মধ্যে আনাই হবে আগামী বাজেটের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
দেশে সুশাসন ও ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার সার্বিক প্রশাসনিক সংস্কারের দিকে হাঁটছে। এখন থেকে একটি রেস্তোরাঁ চালুর জন্য ১৩টি ভিন্ন জায়গা থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব ছাড়পত্র মিলবে। চট্টগ্রাম বন্দর ও শুল্ক বিভাগের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেশনে নিয়ে যাওয়া হবে। বন্দর ও শুল্কায়নের বিভিন্ন স্তরে অনাকাঙ্ক্ষিত খরচ ও বিলম্বের কারণে পণ্যের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়, যা সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করে। সরকারের লক্ষ্য এই ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনা। একই সঙ্গে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড, ওয়ান ওয়ালেট’ চালুর মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি কমানো হবে।
ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি বড় প্রকল্প ঋণের সক্ষমতা নিয়ে সমালোচনা করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকগুলোর কাজ হওয়া উচিত চলতি মূলধন (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) দেওয়া কিংবা গাড়ি-বাড়ি কেনার মতো খুচরা ঋণ দেওয়া। কিন্তু ব্যাংকগুলো এখন এককভাবে বা জোটবদ্ধ হয়ে দুই হাজার কোটি টাকার বড় প্রকল্প ঋণ দিয়ে দিচ্ছে, যা চরম অদক্ষতা।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “সরকার কেন সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের লোকসানের দায় নেবে? বাংলাদেশ বিমানকে কেন ১২টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার খরচ সরকার দেবে? বিমান একটি স্বাধীন এন্টারপ্রাইজ, তারা চাইলে পুঁজিবাজার থেকে টাকা তুলতে পারে।” বড় অর্থায়নের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর চাপ না বাড়িয়ে বন্ড মার্কেট কিংবা দেশের পুঁজিবাজারকে ব্যবহার করার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি আশ্বস্ত করেন, ধস নেমে যাওয়া পুঁজিবাজারকে খুব দ্রুত কার্যকর ও গতিশীল করা হবে।
দেশের তামাক ও পানীয় (সফট ড্রিংকস) খাতে ব্যাপক রাজস্ব ফাঁকি বা চুরির ঘটনা ঘটছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিয়মিত কর দিলেও স্থানীয় অনেক কোম্পানি কর ফাঁকি দিচ্ছে, যা বাজারে একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। কর ফাঁকি দেওয়া এই কালোবাজারিদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিশেষে দেশের করনীতিকে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “এমন একটি করনীতি দেওয়া হবে যা মানুষ সহজে বুঝবে এবং স্বেচ্ছায় কর দিতে উৎসাহিত হবে। শিল্প, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে এই নীতি তৈরি হচ্ছে।” দেশের মানুষের কাছে দুই বছরের সময় চেয়ে তিনি বলেন, “ধৈর্য ধরে এই সময়টুকু অপেক্ষা করুন, দেশের অর্থনীতি নিশ্চিতভাবেই ঘুরে দাঁড়াবে এবং বাংলাদেশ একটি প্রকৃত কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির কাগুজে হিসাব দিয়ে লাভ নেই, সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান বদল আসাই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ।”
উক্ত গোলটেবিল আলোচনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, প্রফেসর সেলিম জাহান, ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ হাতেম এবং ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমানসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও গবেষকগণ।