চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, জলাতঙ্কের প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিনকে এই রোগের বিরুদ্ধে শতভাগ কার্যকর বলে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, সময়মতো সঠিক নিয়মে টিকা নিলে জলাতঙ্ক রোগে মৃত্যুর কোনো সুযোগ থাকার কথা নয়। তবে সম্প্রতি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই চিকিৎসাকৌশল এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সচেতনতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ও ছাপড়হাটি ইউনিয়নে বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হওয়ার পর, যথাযথভাবে চিকিৎসা ও টিকা গ্রহণ সত্ত্বেও মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন মানুষ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিলের পর পুরো জেলাজুড়ে এখন চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ২২ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পাশাপাশি দুটি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে একটি বেওয়ারিশ কুকুর তাণ্ডব চালায়। কুকুরের কামড়ে নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৪ জন গুরুতর জখম হন। আক্রান্তদের স্বজনেরা তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি নিয়ম অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকাও দেওয়া হয়। তবে সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে মে মাসের শুরুর দিকে একে একে মারা যান পাঁচজন আক্রান্ত ব্যক্তি।
মৃত ব্যক্তিদের একজন ফুল মিয়া (৫২)। ঘটনার দিন সকালে তিনি বাড়ির পাশে জমিতে কাজ করার সময় হঠাৎ কুকুরের আক্রমণের শিকার হন এবং কুকুরটি তাঁর নাকে কামড়ে দেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে নাকে সেলাই দিয়ে দুটি টিকা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেলাই কাটার পর তাঁর শরীরে প্রচণ্ড জ্বর আসে এবং একপর্যায়ে বমি শুরু হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর তিনি মারা যান। ফুল মিয়ার মতোই একই রকম উপসর্গ নিয়ে অন্য চারজনও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
টিকা নেওয়ার পরও কেন এই পাঁচজন রোগীকে বাঁচানো গেল না, তা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। গাইবান্ধার সিভিল সার্জন মো. রফিকুজ্জামান এই মৃত্যুর পেছনে কয়েকটি প্রধান চিকিৎসাগত ত্রুটি ও অবহেলার কথা উল্লেখ করেছেন।
জলাতঙ্কের জীবাণু বা রেবিস ভাইরাস ধ্বংস করার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো কামড়ানোর সাথে সাথে ক্ষতস্থানটি কাপড় কাচার ক্ষারযুক্ত সাবান ও রানিং ওয়াটার (প্রবাহিত পানি) দিয়ে অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট ভালো করে ধোয়া। সুন্দরগঞ্জের ঘটনায় মৃতদের পরিবারগুলো এই নিয়মটি সঠিকভাবে পালন করেনি। যেমন, মৃত ফুল মিয়ার পরিবার সাবান ব্যবহার না করে কেবল গরম পানি দিয়ে কয়েক মিনিট ক্ষতস্থান পরিষ্কার করেছিল, যা ভাইরাস দূর করতে ব্যর্থ হয়।
চিকিৎসকদের মতে, কুকুরের কামড় যদি গভীর হয় এবং রক্তক্ষরণ ঘটে, তবে শুধু সাধারণ প্রতিষেধক বা এআরভি (অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন) যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি দ্রুত ক্ষতস্থানে আরআইজি (র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন) ইনজেকশন দিতে হয়। মৃত ব্যক্তিদের অনেকে কেবল সাধারণ টিকা নিয়েছেন কিন্তু আরআইজি নেননি বা পাননি।
আক্রান্ত পাঁচজনের প্রত্যেকেরই কামড়ের স্থান ছিল মুখমণ্ডল বা নাক, যা মানুষের স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্কের খুব কাছাকাছি। ক্ষতস্থান মস্তিষ্কের যত কাছে হবে, রেবিস ভাইরাস তত দ্রুত স্নায়ু বেয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। সাধারণ টিকার মাধ্যমে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে যে সময় লাগে, তার আগেই ভাইরাসটি স্নায়ুতন্ত্রকে বিকল করে দেয়।
সরকারি হাসপাতালে টিকার সংকট থাকায় অনেককে বাইরের ফার্মেসি থেকে ভ্যাকসিন কিনে আনতে হয়েছে। ফার্মেসিগুলোতে সঠিক তাপমাত্রায় (কোল্ড চেইন) টিকা সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালে গিয়ে টিকা পেতে কারও কারও একদিন দেরিও হয়েছিল।
১৪ জন আহতের মধ্যে ৫ জন মারা গেলেও বাকি ৯ জন বর্তমানে সুস্থ আছেন। তাঁদের মধ্যে স্কুলছাত্রী লিমা আক্তার ও লাবণ্য আক্তার জানায়, তারা আক্রান্ত হওয়ার দিনই হাসপাতালে গিয়ে সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত টিকা নিয়েছে এবং বেশ কয়েকদিন হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে থাকার পর এখন পুরোপুরি ভালো আছে।
এই ঘটনার পর টনক নড়েছে স্থানীয় প্রশাসনের। সুন্দরগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ ও গণ-টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জ থেকে আসা ১৮ সদস্যের একটি বিশেষ দল জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সহায়তায় গাইবান্ধায় প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার বেওয়ারিশ কুকুরকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার কাজ শুরু করেছে।
পাশাপাশি, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মানবিক সহায়তা হিসেবে মৃত ব্যক্তিদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীদের সার্বিক তদারকি ও সহায়তা অব্যাহত থাকবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকেও বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হয়েছে এবং সুন্দরগঞ্জে বর্তমানে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি বিশেষ টিম কাজ করছে।