ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শাপলা কলি প্রতীকে অংশ নিয়ে ছয়টি আসনে জয় পায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ফাইল ছবি: এনসিপির ফেসবুক পেজ
তফসিল ঘোষণার আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু করেছে দেশের রাজনীতির নবাগত শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১-দলীয় জোটের অংশ হিসেবে ৬টি আসনে জয়লাভ করে সংসদে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এনসিপি এখন স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এনসিপি কি তবে দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর হাত ছেড়ে একক পথে হাঁটতে শুরু করেছে?
ছবিঃ সংগৃহীত
গত ২৯ মার্চ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে এনসিপি। এরপর ১০ মে আরও ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়। আগামী ২০ মে’র মধ্যে আরও ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এনসিপি নেতাদের মতে, আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণা করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রার্থীদের জনগণের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় প্রস্তুতির অভাব ছিল, যে ভুল তারা স্থানীয় নির্বাচনে করতে চান না। তবে এককভাবে প্রস্তুতি নিলেও জোটের দরজা তারা পুরোপুরি বন্ধ করেননি। জোট হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নির্বাচনের ঠিক আগে নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
এনসিপি এবং জামায়াতের মধ্যে জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে কেন্দ্র করে। এনসিপি এই সিটিতে তাদের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে প্রার্থী করেছে। অন্যদিকে, জামায়াত মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিকের নাম শোনা যাচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থানের এই দুই প্রভাবশালী ছাত্রনেতার মুখোমুখি অবস্থান জোটের ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি ও টানাপোড়েন তৈরি করেছে। এনসিপির ভেতরের একটি অংশ মনে করছে, এই প্রার্থিতা নিয়ে মতভেদ শেষ পর্যন্ত তাদের এককভাবে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করতে পারে।
স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এনসিপি শুধু নিজেদের নেতা নয়, বরং অন্য দল থেকেও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ব্যক্তিদের টানার চেষ্টা করছে। দলটির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যারা অতীতে কোনো অপরাধ বা ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না, তারা যেকোনো দল থেকেই এনসিপির টিকিটে নির্বাচন করার আবেদন করতে পারবেন।
পাঁচ সিটিতে মেয়র পদে এনসিপির প্রার্থীরা–(বাঁ থেকে) আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, আরিফুল ইসলাম আদীব, তারিকুল ইসলাম, আবদুর রহমান আফজাল ও মো. মোবাশ্বের আলী ছবি: সংগৃহীত
ইতোমধ্যেই এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন সাবেক জামায়াত আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান, বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার এবং এবি পার্টি ও গণ অধিকার পরিষদের অনেক নেতা-কর্মী। এই দলবদল এনসিপির সাংগঠনিক শক্তিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তারা মনে করছেন, অভিজ্ঞ ও পরিচিত মুখদের অন্তর্ভুক্ত করার ফলে নির্বাচনের মাঠে তারা বড় চমক দেখাতে পারবেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এনসিপির তরুণ প্রার্থীদের বিপুল জনপ্রিয়তা থাকলেও সেই ঢেউ সব জায়গায় ভোটের বাক্সে রূপান্তর হয়নি। অনেক আসনে তারা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও জয়ের ব্যবধান ছিল চোখে পড়ার মতো। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও জেন-জি প্রজন্মের এই দলের উত্থান ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন এনসিপির জন্য এখন নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের এসিড টেস্ট।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ স্থানীয় নির্বাচন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হাতে পর্যাপ্ত সময় রেখেই এনসিপি তাদের ঘর গোছানোর কাজ শেষ করতে চায়। তারা জানে, এককভাবে নির্বাচন করলে দলের শক্তি ও দুর্বলতা পরিষ্কার হবে, আবার জোটবদ্ধ হলে জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে। এই দ্বিমুখী কৌশলেই এনসিপি এখন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত শক্তিতে পরিণত হয়েছে।