
দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এখন কেবল একটি বিকাশমান উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির অন্যতম কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে। বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে অবস্থিত বাংলাদেশ একই সঙ্গে ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর, অস্থিতিশীল মিয়ানমার, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার এবং ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের সংযোগস্থলে অবস্থিত। বিশ্ব রাজনীতিতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্ব যত বাড়ছে, এই অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান ততটাই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। আর এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণেই বিশ্বের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে রয়েছে ঢাকা।
ভারতের ‘র’ (RAW), পাকিস্তানের ‘আইএসআই’ (ISI), যুক্তরাষ্ট্রের ‘সিআইএ’ (CIA), চীনের ‘এমএসএস’ (MSS), যুক্তরাজ্যের ‘এমআই৬’ (MI6) এবং ইসরাইলের ‘মোসাদ’ (Mossad)—প্রতিটি সংস্থাই তাদের নিজ নিজ জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে।
বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহের মূল ভিত্তি এর ভৌগোলিক অবস্থান। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব এশিয়ায় জ্বালানি পরিবহন এবং বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য বঙ্গোপসাগর অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি পথ। চট্টগ্রাম, মোংলা ও মাতারবাড়ীর মতো গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো উন্নয়ন এবং এ সম্পর্কিত অবকাঠামোগত পরিকল্পনা কেবল বাণিজ্য বৃদ্ধিতেই ভূমিকা রাখছে না, বরং সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতার দিক থেকেও আন্তর্জাতিক শক্তির কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রতিটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার বাংলাদেশ কেন্দ্রিক আগ্রহের ধরন ভিন্ন:
ভারত (RAW): উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা, শিলিগুড়ি করিডোরের সুরক্ষা, আন্তঃসীমান্ত চরমপন্থা প্রতিরোধ এবং অর্থনৈতিক ট্রানজিটের জন্য সীমান্ত অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ভারতের অগ্রাধিকার।
পাকিস্তান (ISI): অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণ, সীমান্ত পরিস্থিতি, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের অবস্থান এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
যুক্তরাষ্ট্র (CIA): ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অধীনে অবাধ নৌ-চলাচল, সমুদ্র নিরাপত্তা, চরমপন্থা দমন এবং অঞ্চলে চীনের প্রভাব পর্যবেক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের মূল এজেন্ডা।
চীন (MSS): বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) আওতায় তাদের কোটি কোটি ডলারের অবকাঠামোগত বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বজায় রাখা চীনের প্রাথমিক লক্ষ্য।
যুক্তরাজ্য (MI6): কমনওয়েলথ সংযোগ, বিপুল পরিমাণ প্রবাসী সম্প্রদায়, আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কারণে আগ্রহী।
ইসরাইল (Mossad): সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সংযোগকারী আন্তর্জাতিক অপরাধ বা গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের স্বার্থে নজরদারি রাখতে পারে।
এর বাইরে মিয়ানমারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও প্রায় দশ লাখ রড্রিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাময়িক আশ্রয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের চিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সীমান্তবর্তী মানবপাচার, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তবে দেশের ভেতর যেকোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন বা সংকটের জন্য অন্ধভাবে বিদেশি ষড়যন্ত্রকে দায়ী করা বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের পরিপন্থী। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিজস্ব স্বার্থেই তথ্য সংগ্রহ করবে—এটি বিশ্বনীতির অংশ। বাংলাদেশের মতো স্বাধীন ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের মূল কাজ হলো বিদেশি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে প্রতিগোয়েন্দা (Counter-intelligence) ব্যবস্থার উন্নয়ন করা, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।
জাতীয় ঐক্য, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাই বাংলাদেশকে এই বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক খেলায় নিরাপদ ও শক্তিশালী রাখতে পারে।