প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়

দীর্ঘ দেড় দশক ধরে সশস্ত্র বাহিনীতে চলা বঞ্চনা, অবিচার ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান ঘটাতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত, অব্যাহতি পাওয়া এবং বরখাস্ত হওয়া ১৫০ জন কর্মকর্তাকে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের অনেককে স্বাভাবিক অবসরের সুবিধা দেওয়া হয়েছে, আবার অনেককে বড় পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি (Retroactive Promotion) দেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। প্রতিরক্ষা সচিব মো. আশরাফ উদ্দিনের স্বাক্ষরিত এই আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ৩ মে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটির সুপারিশ এবং তিন বাহিনীর সদরদপ্তরের মতামতের ওপর ভিত্তি করেই এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বিশেষ সুবিধা ও পুনর্বাসন পাওয়া ১৫০ জন কর্মকর্তার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। সেনাবাহিনীর ১১৫ জন, নৌবাহিনীর ২১ জন এবং বিমানবাহিনীর ১৪ জন কর্মকর্তা এই প্রজ্ঞাপনের আওতায় এসেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের ওপর যে পেশাগত অন্যায় করা হয়েছিল, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তার আংশিক ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করা হয়েছে।
সরকারের এই নতুন আদেশে অনেক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, যোগ্যতার ভিত্তিতে কোনো কোনো কর্মকর্তা এককালীন ৩০ লাখ টাকা, কেউ ৫০ লাখ টাকা, আবার কেউ কেউ সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা পাবেন। এর পাশাপাশি, প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি বা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ব্যবস্থাপনায় তাঁদের প্লট অথবা ফ্ল্যাট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বয়স ও শারীরিক যোগ্যতা সাপেক্ষে এই কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পুনরায় পদায়নেরও সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অধিকাংশ কর্মকর্তার বাধ্যতামূলক বা অকালীন অবসর বাতিল করা হয়েছে। তাঁদের বয়সসীমা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত চাকরি বহাল ধরে নিয়ে এখন ‘স্বাভাবিক অবসর’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এর ফলে তাঁরা সংশ্লিষ্ট পদে চাকরির মেয়াদ পর্যন্ত সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা এবং বিধি অনুযায়ী আর্থিক সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে অনেক কর্মকর্তাকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল, মেজর জেনারেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও কর্নেল পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
সুবিধাপ্রাপ্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী। ২০০৯ সালের ২৪ জুন তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তাঁকে ২০১১ সালে ভূতাপেক্ষ মেজর জেনারেল এবং ২০১৪ সালে অবসরে যাওয়ার ঠিক আগে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তিনি দুই পদেরই বকেয়া বেতন-ভাতা, ১ কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তালিকায় আরও রয়েছেন স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমী। ২০০৯ সালের ১২ মার্চ তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তে তাঁর অবসর সংশোধন করে ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট স্বাভাবিক অবসর দেখানো হয়েছে। ফলে তিনি দীর্ঘ চার বছরের বকেয়া সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
এছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদের সামরিক সচিব লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আমিনুল করিমের ২০০৯ সালের বাধ্যতামূলক অবসর সংশোধন করে ২০১২ সালের ৩০ জুন স্বাভাবিক অবসর দেখানো হয়েছে। তিনিও তাঁর সংশ্লিষ্ট পদের বকেয়া বেতন ও ভাতা ফিরে পাবেন।