২০২৬ সালের নতুন পে-স্কেল: ধাপে ধাপে বাড়বে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন, কেমন প্রভাব পড়বে বাজারে - Uttorpatro TV

২০২৬ সালের নতুন পে-স্কেল: ধাপে ধাপে বাড়বে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন, কেমন প্রভাব পড়বে বাজারে

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: September 4, 2026
ছবি- অনলাইন থেকে সংগৃহীত

দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের বেতন কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নবম জাতীয় বেতন স্কেল বা পে-স্কেল ২০২৬ দুই বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ, সরকারের রাজস্ব পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে এই পদ্ধতিতে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার কথা ভাবা হচ্ছে।

বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সরকারি কর্মীদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত মোট ব্যয়ের পরিমাণ ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি।

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের ওপর এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। ফলে একবারে পুরো বেতন কাঠামো পরিবর্তনের পরিবর্তে কয়েক ধাপে এটি কার্যকর করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক কম আয়ের কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ বেতন বৃদ্ধির আর্থিক চাপ একসঙ্গে সরকারের ওপর না দিয়ে সময়ের ব্যবধানে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর দাবি দীর্ঘদিনের। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে একই বেতন কাঠামোর আওতায় রয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ সময়ে দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বর্তমান বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কমিশন এ বিষয়ে সুপারিশ দেওয়ার পর বর্তমান সরকার তা পর্যালোচনার জন্য নতুন একটি কমিটি গঠন করেছে। ফলে কমিশনের সুপারিশের বাস্তবায়ন কাঠামো এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সংস্থান। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারকে বিকল্প উৎস বিবেচনা করতে হতে পারে। বেতন-ভাতা খাতে বড় ধরনের ব্যয় বাড়লে বাজেটের অন্যান্য খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, যদি এক বছরের মধ্যে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া অথবা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তাঁর মতে, সাধারণত এডিপির পুরো বরাদ্দ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। ফলে বাস্তবায়ন না হওয়া অর্থের একটি অংশ বেতন কাঠামো পরিবর্তনের ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করার সুযোগ থাকতে পারে।

চলতি অর্থবছরে এডিপির আকার প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। এর একটি অংশ বাস্তবায়ন না হলে সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থ অব্যবহৃত থাকতে পারে। অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই অর্থের একটি অংশ নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাজে লাগানো সম্ভব হতে পারে। তবে এতে উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকবে।

নতুন বেতন কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। এতে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে। কিন্তু একই সময়ে যদি পণ্য ও সেবার সরবরাহ সেই অনুপাতে না বাড়ে, তাহলে অতিরিক্ত চাহিদা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ থেকে ৮ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বাজারে এর প্রভাব কী হবে, সেটিও নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে বাসাভাড়া, পরিবহন, বিনোদন এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দামে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রসেসড ফুডসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে মানুষের বাড়তি ক্রয়ক্ষমতা বাজারের চাহিদা বাড়াতে পারে। কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহ একই হারে বৃদ্ধি না পেলে সেই বাড়তি চাহিদা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়াতে পারে। এর ফলে বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ মূল্যস্ফীতির কারণে আবারও ব্যয়ের খাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু সরকারি চাকরিজীবীরাই নয়, বেসরকারি খাতের কর্মী ও স্বকর্মসংস্থানে নিয়োজিত মানুষেরাও চাপের মুখে পড়তে পারেন। কারণ বাজারে পণ্য ও সেবার দাম বাড়লে নির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর বাইরে থাকা মানুষের প্রকৃত আয় কমে যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, তাই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল তুলনামূলক বেশি হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি এবং উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাও জরুরি।

সব মিলিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত একটি পরিবর্তন হলেও এর সঙ্গে সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নটি সরাসরি জড়িত। বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এর সুফল সীমিত হয়ে যেতে পারে। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনার মাধ্যমে একদিকে সরকারি কর্মীদের প্রত্যাশা পূরণ এবং অন্যদিকে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ নিয়ন্ত্রণ—দুই দিকই সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।