জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ এবং গুম-খুনের শিকার পরিবারের সদস্যদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগের কারণেই দেশের মানুষ ফ্যাসিস্ট শক্তির হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাবে।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শহীদ ও গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনে গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ৭৪ জনের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘদিনের কষ্ট, স্বজন হারানোর বেদনা এবং অনিশ্চয়তার পর নিয়োগপত্র হাতে পেয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার বা ক্ষমতাসীনরা তাদের শক্তির উৎস নন; বরং এসব পরিবারই সরকারের জন্য শক্তি, উৎসাহ ও উদ্দীপনার উৎস। তাদের ত্যাগ ও কষ্টের কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কোনো একটি সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বহু মানুষ দেশের অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। একই সঙ্গে নির্যাতন, গুম ও হত্যার শিকার পরিবারগুলোর পাশে সরকার ভবিষ্যতেও থাকবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় নানা ধরনের বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা থাকে। এসব কারণে অনেক সময় মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সবকিছু দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। তবে প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার পিছিয়ে যাবে না। ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে চাকরির নিয়োগপত্র পাওয়া পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিল আবেগঘন পরিবেশ। স্বজন হারানোর বেদনার সঙ্গে নতুন কর্মজীবনের সুযোগ পাওয়ার অনুভূতি তাদের মধ্যে ভিন্ন মাত্রা তৈরি করে। নিয়োগপত্র পাওয়ার পর অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সরকারের পক্ষ থেকে এই নিয়োগকে শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। চাকরির সুযোগ তাদের পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতা তৈরিতে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, যারা দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। শুধু চাকরি দেওয়ার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়েও সরকারের মনোযোগ থাকবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার সঙ্গে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গভীরভাবে যুক্ত। তাই একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শহীদদের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই সরকার কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত পরিবারের সদস্যরা বলেন, স্বজন হারানোর ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। তবে রাষ্ট্র তাদের পরিবারের দায়িত্ব ও ত্যাগকে স্বীকৃতি দেওয়ায় তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। বিশেষ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ পরিবারের ভবিষ্যৎকে কিছুটা নিরাপদ করবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিহত এবং গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের পুনর্বাসন বর্তমান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। এসব পরিবারের জন্য কর্মসংস্থান, আর্থিক সহায়তা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ তাদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী পুনর্বার শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করেন যে, সরকার তাদের পাশে থাকবে। তিনি বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
এদিকে ৭৪ জন পরিবারের সদস্যের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সরকারের একটি দৃশ্যমান উদ্যোগ সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত হবে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।