গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে নাকাল দেশ, এলএনজি কিনতেও হিমশিম সরকার - Uttorpatro TV

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে নাকাল দেশ, এলএনজি কিনতেও হিমশিম সরকার

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 25, 2026

সারা দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় একদিকে আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার সমস্যা বাড়ছে, অন্যদিকে গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানায় কমে গেছে উৎপাদন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে লোডশেডিং। এতে জনজীবনের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

পেট্রোবাংলার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে দৈনিক প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ মিলছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ব্যবধানের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার কারখানা, আবাসিক এলাকা ও সিএনজি স্টেশন—সব খাতেই সংকটের প্রভাব পড়েছে।

গ্যাসের স্বল্পতার কারণে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি স্টেশনেও ভোগান্তি বেড়েছে। সরবরাহের চাপ কম থাকায় দিনের নির্দিষ্ট সময়ে অনেক পাম্পে বিক্রি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কোনো কোনো স্টেশনে একসঙ্গে সব ডিসপেনসার চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গাড়িচালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সিএনজি নিতে পারছেন না।

আবাসিক গ্রাহকদের অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। দিনের বড় একটি সময়ে অনেক এলাকায় চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস থাকছে না। রাতে কিছুটা সরবরাহ পাওয়া গেলেও একই সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। এতে পরিবারের বাড়তি ব্যয়ও বাড়ছে।

শিল্প খাতেও সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতার বড় একটি অংশ অব্যবহৃত থাকছে। বিভিন্ন শিল্প উদ্যোক্তার তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। সময়মতো পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার প্রভাব বেশি পড়ছে। অনেক কারখানা নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে উৎপাদন চালালেও গ্যাস সংকটের কারণে সেখানেও স্বাভাবিক উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং বিদ্যুৎ সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতের তথ্যও সংকটের চিত্র স্পষ্ট করছে। পিক আওয়ারে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬ হাজার ২০০ থেকে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে উঠলেও উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। এতে সর্বোচ্চ সময়ে ঘাটতি থাকছে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এই ঘাটতি সামাল দিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

ঢাকা ও আশপাশের এলাকাতেও বিদ্যুতের ঘাটতির প্রভাব পড়েছে। ডিপিডিসি ও ডেসকোর আওতাধীন এলাকায় দিনের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি আরও কঠিন। গ্যাসের স্বল্পতায় ক্যাপটিভ পাওয়ার থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় সংকট আরও বেশি। কোনো কোনো পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে অনেক গ্রাহককে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে এমন লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।

গ্যাস সংকটের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির জটিলতা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। গত কয়েক মাসে এশিয়ার স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) প্রায় ২২ থেকে ২৫ ডলার পর্যন্ত দামে এলএনজি কেনার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সরকারের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহকারী পাওয়া। আগস্ট মাসের জন্য কয়েক দফা দরপত্র আহ্বান করেও নির্দিষ্ট কয়েকটি কার্গোর সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি। ফলে চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি এনে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক প্রায় ৭৪০ থেকে ৭৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকেও সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে দেশীয় কূপ ও এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত সক্ষমতার তুলনায় বাস্তবে পাওয়া গ্যাস অনেক কম হওয়ায় সামগ্রিক ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে প্রাপ্ত গ্যাসের বড় অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে শিল্প, আবাসিক এবং সিএনজি খাতের জন্য সরবরাহ আরও সীমিত হয়ে পড়ছে। গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ না বাড়ায় সংকটের চাপ এক খাত থেকে অন্য খাতে ছড়িয়ে পড়ছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নতুন করে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যের দুটি কোম্পানি থেকে দুই কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একটি কার্গোর দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ দশমিক ৬২৫ ডলার এবং অন্যটির দাম ২৪ দশমিক ২৫ ডলার নির্ধারিত হয়েছে। এর আগে আরেকটি কার্গো প্রায় ২৩ দশমিক ৯৩ ডলার দরে কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

তবে শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, শুধু এলএনজি আমদানির ঘোষণা যথেষ্ট নয়; জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, গ্যাসের চাপ কখন স্বাভাবিক হবে—এ বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা প্রয়োজন। কারণ জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে উৎপাদন পরিকল্পনা, শ্রমিক ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি অর্ডার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য সংকট কাটাতে সময় লাগবে বলে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, এলএনজির উচ্চমূল্য এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি চাহিদার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সংকট পুরোপুরি দূর করা কঠিন। তবে শিল্প ও জনজীবনে ক্ষতি কমাতে গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।