রংপুর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক ঘটনার জট খুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ তাঁর পুরো পরিবারকে নিঃশেষ করে দেওয়ার নেপথ্যে কোনো পেশাদার ডাকাত দল ছিল না; বরং ছাদে বসে মাদক সেবনে বাধা দেওয়া ও চিনে ফেলার ভয়েই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায় স্থানীয় দুই যুবক। পুলিশ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোববার ভোরে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত দুই ঘাতককে আটক করতে সক্ষম হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় ও পুলিশের সংবাদ সম্মেলন
রোববার দুপুরে আয়োজিত এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ ও তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরেন। আটক হওয়া দুই অভিযুক্ত হলেন—
মুগ্ধ দাস (২৩): নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে।
সিদ্ধার্থ দাস (১৯): একই এলাকার বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে।
পুলিশ কমিশনার জানান, চার লাশ উদ্ধারের পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক ইউনিট ক্লুলেস এই ঘটনার তদন্তে মাঠে নামে। বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি ও স্থানীয় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ভোরেই এই দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই আটক দুজন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে পুরো ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ বিবরণ: মাদক সেবনে বাধা ও এক এক করে খুন
পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে, গত ২০ আগস্ট শেষ রাতের দিকে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের ছাদে উঠে আড্ডা এবং মাদক সেবন করছিলেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। তারা দীর্ঘ দিন ধরেই সুযোগ বুঝে ওই ছাদে উঠে নেশা করতেন।
ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তারা ছাদে যায়। শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী বিষয়টি টের পেয়ে ছাদে উঠে এসে তাদের মাদক সেবনে বাধা দেন এবং প্রতিবাদ জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে ধরে গলায় গামছা ও কাপড় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ছাদে ফেলে রাখে।
ছাদে অস্বাভাবিক শব্দ পেয়ে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা নিচে থেকে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসেন। ঘাতকরা ধরা পড়ার ভয়ে প্রীতিলতার ওপর চড়াও হয় এবং তাকেও একইভাবে গামছা ও দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
মা ও বাবার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে এরপর স্নাতকোত্তর পাশ করা বড় মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী ঘটনাস্থলে এলে তাকেও সিঁড়িতে কুপিয়ে ও শ্বাসরোধ করে নৃশংসভাবে খুন করা হয়।
সবশেষে, পুরো ঘরের নীরবতা ও গোলমালে ঘুম ভেঙে যায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের। সে ঘর থেকে বেরিয়ে ঘাতকদের চিনে ফেলে এবং তাদের নাম ধরে ফেলে। নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে এবং আলামত ধ্বংস করতে নিষ্পাপ শিশু প্রিয়মকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে তারা। লাশটি লুকাতে তারা প্রিয়মের দেহ শোবার ঘরের খাটের নিচে ঠেলে রেখে দেয়।
এক এক করে চারজনকে নৃশংসভাবে খুন করার পর দুই ঘাতক ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। আলমারি ও ড্রয়ার তছনছ করে সেখানে থাকা স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য জিনিসপত্র লুট করে তারা বাইরে থেকে ঘরের প্রধান গেটে তালা লাগিয়ে চম্পট দেয়।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে ওই পরিবারের কাউকে বাইরে দেখা যায়নি। স্বজনরা মোবাইলে কল দিয়েও তাদের পাচ্ছিলেন না। প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী শনিবার রাত ৯টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখেন বাড়িটি অন্ধকার এবং বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। এরপর দুর্গন্ধে সন্দেহ হলে ৯৯৯ ও কোতোয়ালি থানায় খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে খাটের নিচে প্রিয়ম, সিঁড়িতে মা-মেয়ে এবং ছাদে গণপতির পচাগলা লাশ উদ্ধার করে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী এলাকায় অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। অবসর জীবনে তিনি সমবায় মার্কেটে হোমিও চিকিৎসাসেবা দিতেন। তাঁর বড় মেয়ে আগামী কারমাইকেল কলেজ থেকে এবার মাস্টার্স শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং ছোট ছেলে প্রিয়ম পড়ত জিলা স্কুলে। এমন একটি নিরীহ ও ভালো পরিবারের ওপর মাদকসেবীদের এমন নৃশংসতায় পুরো রংপুর শহর জুড়ে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্কের জোয়ার বইছে।
পুলিশ কমিশনার জানান, এ ঘটনার পেছনে আটক দুজন ছাড়া আর কারও প্ররোচনা বা পরোক্ষ মদদ ছিল কি না, তা আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আসামি দুজনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।