খালেদা জিয়া: সংগ্রাম, রাজনীতি ও মানুষের ভালোবাসায় এক জীবন - Uttorpatro TV

খালেদা জিয়া: সংগ্রাম, রাজনীতি ও মানুষের ভালোবাসায় এক জীবন

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: August 16, 2026

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম খালেদা জিয়া। তার রাজনৈতিক জীবন যেমন নানা সাফল্যে সমৃদ্ধ, তেমনি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতায়ও পরিপূর্ণ। একজন সাধারণ গৃহবধূ হিসেবে জীবন শুরু করে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে আসা এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথটি তার জন্য ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের।

স্বামী জিয়াউর রহমানের আকস্মিক মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। দুই সন্তানকে নিয়ে ব্যক্তিগত শোক ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই তিনি দেশের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি। ১৯৮৩ সালে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব এবং পরের বছর বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়।

রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার উত্থান ছিল বাংলাদেশের জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ঘটনা। পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক পরিসরে তিনি ধীরে ধীরে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক দৃঢ়তা এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতার কারণে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেতায় পরিণত হন।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। আশির দশকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্ব দেন। বিভিন্ন সময়ে তাকে আটক ও রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়। তবে আন্দোলন থেকে সরে না গিয়ে তিনি তার রাজনৈতিক অবস্থান অব্যাহত রাখেন।

১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে তার আটক হওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হয়। দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনে তার ভূমিকার কারণে রাজনৈতিক পরিসরে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে একটি বড় পরিবর্তন আসে।

তার সরকারের সময়ে শিক্ষা, নারীশিক্ষা, মেয়েদের উপবৃত্তি, নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তির কার্যক্রম পরবর্তী সময়ে দেশের নারীশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার রাজনৈতিক পথ অবশ্য সবসময় মসৃণ ছিল না। ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক বিরোধ, আন্দোলন ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে তাকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়েছে। তবু জাতীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান দীর্ঘদিন অটুট ছিল।

এক-এগারোর সময় কঠিন সিদ্ধান্ত

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি আলোচিত সময় ছিল ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পরবর্তী পরিস্থিতি। রাজনৈতিক সংকটের সেই সময়ে তাকে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে তার রাজনৈতিক অনুসারীরা দাবি করেন। কিন্তু তিনি দেশেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

পরবর্তী সময়ে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। তার বড় ছেলে তারেক রহমান এবং ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোও সেই সময় রাজনৈতিক ও আইনি প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন। সন্তানদের গ্রেপ্তার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ একজন মা হিসেবে খালেদা জিয়ার জীবনে গভীর ব্যক্তিগত আঘাত তৈরি করে।

রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি সন্তানদের নিয়ে তার উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তাও ছিল দীর্ঘদিনের। দুই ছেলের জীবনের নানা প্রতিকূলতা এবং পরে তাদের বিদেশে অবস্থান তার ব্যক্তিগত জীবনের অন্যতম বেদনাময় অধ্যায় হয়ে ওঠে।

বাসভবন ছাড়ার ঘটনা ও ব্যক্তিগত শোক

২০১০ সালের নভেম্বরে ঢাকার সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসভবন থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হয়। দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন ছাড়তে বাধ্য হওয়ার ঘটনা তার ব্যক্তিগত জীবনের কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এরপর আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু তার জীবনে আরেকটি বড় আঘাত হয়ে আসে। সন্তানের মৃত্যু একজন মায়ের জন্য যে গভীর শূন্যতা তৈরি করে, সেই শোকও তাকে বহন করতে হয়েছে রাজনৈতিক জীবনের নানা ব্যস্ততা ও প্রতিকূলতার মধ্যেই।

কারাবাস ও অসুস্থতার সময়

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্যায়ের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি ছিল কারাবাস। ২০১৮ সালে একটি মামলায় সাজা হওয়ার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন তিনি। ২০২০ সালে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও তার চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থাকে ঘিরে উদ্বেগ অব্যাহত ছিল। বয়স ও অসুস্থতার কারণে পরবর্তী সময়ে তার জনসমক্ষে রাজনৈতিক উপস্থিতিও সীমিত হয়ে পড়ে।

তবে শারীরিক দুর্বলতার মধ্যেও বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তার রাজনৈতিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দলের নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে থেকে যান।

দীর্ঘ প্রতিকূলতার পর মুক্তি

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর খালেদা জিয়ার জীবনে নতুন একটি অধ্যায় আসে। দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব ও শর্তসাপেক্ষ মুক্তির অবসান ঘটে এবং তিনি পুরোপুরি মুক্তি লাভ করেন। তবে দীর্ঘ কারাবাস ও শারীরিক জটিলতার কারণে তখন তার স্বাস্থ্য অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

মুক্তির পরও চিকিৎসা তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। দেশ ও বিদেশে তার চিকিৎসা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নিয়মিত আলোচনা হয়েছে। বয়সজনিত বিভিন্ন জটিলতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি।

শেষ বিদায়ে মানুষের ঢল

২০২৫ সালের শেষ দিকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ৩০ ডিসেম্বর ভোরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিএনপির নেতাকর্মী ছাড়াও বিপুলসংখ্যক মানুষ শোক প্রকাশ করেন। পরদিন তার মরদেহ নেওয়া হলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। গুলশান থেকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের সমাগম হয়।

দলীয় রাজনীতির সীমারেখা ছাড়িয়ে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে আছে। তার শেষ বিদায়ে মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতি সমর্থকদের আবেগ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হয়।

ইতিহাসে খালেদা জিয়ার অবস্থান

খালেদা জিয়ার জীবনকে শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর জীবন দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তার পরিচয়ের সঙ্গে একজন স্ত্রী, মা, রাজনৈতিক সংগঠক এবং রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকা জড়িয়ে আছে। স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতিতে প্রবেশ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক সংকট, কারাবাস ও দীর্ঘ অসুস্থতা—সব মিলিয়ে তার জীবন ছিল ঘটনাবহুল।

তার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিতর্ক ও ভিন্নমত থাকলেও জাতীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘ সময় তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আজ তিনি জীবিত নেই। কিন্তু তার রাজনৈতিক কর্মজীবন, আন্দোলন, নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিগত সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক; আর ইতিহাসের বিচারে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে।